জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন মানুষ চারদিক থেকে নিজেকে অসহায় মনে করে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যায় না। যে সমস্যাটি সামনে এসেছে, সেটি এত কঠিন মনে হয় যে নিজের সামর্থ্য দিয়ে তার সমাধান করা যেন অসম্ভব। তখন মানুষ পরিচিত-অপরিচিত অনেক দরজায় কড়া নাড়ে, মানুষের সাহায্য চায়, পরামর্শ নেয়। কিন্তু সব দরজা যখন বন্ধ মনে হয়, তখন একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো মহান আল্লাহ।
কারণ মানুষের ক্ষমতার সীমা আছে, কিন্তু আল্লাহর ক্ষমতার কোনো সীমা নেই। আমরা যাকে অসম্ভব মনে করি, আল্লাহর কাছে তা মুহূর্তের ব্যাপার। তাই বিপদের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া, তাঁর ওপর ভরসা করা এবং কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গড়ে তোলা একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত এমনই একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করে। এই আয়াতগুলোতে তাকওয়া অবলম্বনকারী মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে পথ বের করে দেওয়া এবং অপ্রত্যাশিত স্থান থেকে রিজিক দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সূরা আত-ত্বালাকের ২ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন—
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।”
এরপর ৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে—
“এবং তিনি তাকে রিজিক দেন এমন স্থান থেকে, যা সে কল্পনাও করে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
এই দুটি আয়াতের মধ্যে একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য অসাধারণ সান্ত্বনা রয়েছে।
ভাবুন তো, আপনি এমন একটি সমস্যায় পড়েছেন যার কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছেন না। আপনি মনে করছেন সামনে কোনো রাস্তা নেই। অথচ আল্লাহ বলছেন, যে ব্যক্তি তাঁকে ভয় করে এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেবেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে—শুধু মুখে আয়াত পড়ে কোনো নির্দিষ্ট পার্থিব ফল পাওয়া নিশ্চিত হয়ে যাবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। আয়াতের মূল শিক্ষা হলো তাকওয়া, তাওয়াক্কুল, আল্লাহর আনুগত্য এবং তাঁর ওপর পূর্ণ নির্ভরতা।
“অসম্ভব” আসলে কার কাছে?
আমাদের জীবনে “অসম্ভব” শব্দটি খুব পরিচিত। কারও কাছে চাকরি পাওয়া অসম্ভব মনে হয়, কারও কাছে ঋণ পরিশোধ করা অসম্ভব, কারও কাছে বিয়ের সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব, কারও কাছে দীর্ঘদিনের কোনো আশা পূরণ হওয়া অসম্ভব মনে হয়।
কেউ হয়তো বছরের পর বছর একটি সমস্যার মধ্যে আছেন। অনেক চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ফল পাননি। একসময় মনে হয়, “আমার জন্য আর কিছুই করার নেই।”
ঠিক তখনই ঈমান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—আমার জন্য কিছু না থাকলেও আল্লাহর কাছে সবকিছু আছে।
মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না। তাই সে একটি সমস্যার বর্তমান অবস্থা দেখে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কিন্তু আল্লাহ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—সবকিছু জানেন।
আজ যে দরজা বন্ধ, কাল সেটিই হয়তো খুলে যাবে। আজ যে ব্যক্তি সাহায্য করছে না, কাল হয়তো আল্লাহ তার মন পরিবর্তন করে দেবেন। আজ যে সুযোগটি নেই, কয়েক দিন পর তার চেয়েও ভালো সুযোগ সামনে আসতে পারে।
তাই একজন মুমিন কখনো শুধু বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আল্লাহর রহমত সম্পর্কে হতাশ হয় না।
আয়াত দুটির মূল শিক্ষা: তাকওয়া
সূরা আত-ত্বালাকের ২ নম্বর আয়াতে প্রথম যে বিষয়টি বিশেষভাবে এসেছে, সেটি হলো তাকওয়া।
তাকওয়া বলতে শুধু ভয় বোঝায় না। আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দেওয়া, তাঁর আদেশ পালন করা এবং নিষেধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাও তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত।
অনেক সময় আমরা দোয়া করি—
“হে আল্লাহ, আমার সমস্যা দূর করে দিন।”
কিন্তু একই সঙ্গে যদি আমরা জেনে-শুনে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত থাকি, তাহলে নিজেদের জীবনেও পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা দরকার।
তাই কোনো কঠিন সমস্যায় পড়লে শুধু দোয়া নয়, নিজের জীবনটাকেও একটু দেখে নেওয়া উচিত।
- আমি কি নামাজ ঠিকভাবে আদায় করছি?
- আমি কি হারাম থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি?
- কারও হক নষ্ট করেছি কি?
- কারও প্রতি অন্যায় করেছি কি?
- আমার উপার্জন হালাল তো?
- আমি কি বাবা-মায়ের সঙ্গে ভালো আচরণ করছি?
- আমি কি গোপনে এমন কোনো গুনাহ করছি, যা আমাকে আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে?
নিজেকে এসব প্রশ্ন করা দরকার।
কারণ কুরআনের এই আয়াত আমাদের শুধু “সমাধান চাইতে” শেখায় না; বরং সমাধানের যোগ্য একটি জীবন গড়তেও শেখায়।
তারপর আসে তাওয়াক্কুল
৩ নম্বর আয়াতের একটি অত্যন্ত সুন্দর অংশ হলো—
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”
তাওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়। তাওয়াক্কুল হলো নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
ধরুন আপনি চাকরি চান। আপনি দোয়া করলেন, কিন্তু কোনো চাকরির আবেদন করলেন না। কোনো প্রস্তুতি নিলেন না। কোনো চেষ্টা করলেন না। শুধু অপেক্ষা করলেন—এটা তাওয়াক্কুলের সঠিক ধারণা নয়।
বরং আপনাকে—
- নিজের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
- ভালোভাবে সিভি তৈরি করতে হবে।
- চাকরির জন্য আবেদন করতে হবে।
- প্রয়োজন হলে মানুষের পরামর্শ নিতে হবে।
- হালাল পথে চেষ্টা করতে হবে।
- তারপর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।
এটাই তাওয়াক্কুলের সুন্দর ভারসাম্য।
কীভাবে এই আয়াতগুলো আমল করবেন?
অনেকে জানতে চান, “তাহলে সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত কীভাবে পড়ব?”
এর সহজ উত্তর হলো—কুরআনের আয়াত হিসেবে এগুলো নিয়মিত তিলাওয়াত করা যায় এবং এর অর্থ বুঝে আল্লাহর কাছে দোয়া করা যায়।
এর জন্য এমন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বা সময়কে বাধ্যতামূলক মনে করা উচিত নয়, যদি তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য শরয়ি দলিল না থাকে।
আপনি চাইলে নিজের দৈনন্দিন আমলের মধ্যে এই আয়াতগুলো রাখতে পারেন।
উদাহরণ হিসেবে—
১. ওযু করে শান্তভাবে বসুন।
২. আল্লাহর প্রশংসা করুন।
৩. দরুদ পড়ুন।
৪. সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত তিলাওয়াত করুন।
৫. আয়াতের অর্থ ও শিক্ষা নিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করুন।
৬. নিজের সমস্যার কথা আল্লাহর কাছে খুলে বলুন।
৭. হালাল পথে চেষ্টা করার জন্য আল্লাহর সাহায্য চান।
৮. শেষে আবার আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
এখানে মূল বিষয় হলো সংখ্যা নয়, আন্তরিকতা।
শুধু নিজের চাওয়া নয়, আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপরও ভরসা করুন
আমরা সাধারণত দোয়া করার সময় একটি নির্দিষ্ট ফল চাই। যেমন—
“এই চাকরিটা আমাকে দিতেই হবে।”
“এই মানুষটিকেই আমার জীবনে দিতে হবে।”
“এই ব্যবসাটাই সফল করে দিতে হবে।”
কিন্তু আমরা জানি না কোনটি আমাদের জন্য ভালো।
হয়তো যে চাকরিটিকে আপনি জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ ভাবছেন, সেটিই ভবিষ্যতে আপনার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার যে সুযোগটি এখন ছোট মনে হচ্ছে, সেটিই আপনার জীবনে বড় কল্যাণ নিয়ে আসতে পারে।
তাই দোয়ার মধ্যে একটি সুন্দর মানসিকতা থাকা উচিত—
“হে আল্লাহ, আমি যা চাই তা যদি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে তা সহজ করে দিন। আর যদি এতে আমার জন্য অকল্যাণ থাকে, তাহলে আমাকে তা থেকে দূরে রাখুন এবং আমার জন্য উত্তম কিছু নির্ধারণ করুন।”
এমন মানসিকতা মানুষকে অস্থিরতা থেকে বাঁচায়।
রিজিক শুধু টাকা-পয়সার নাম নয়
সূরা আত-ত্বালাকের ৩ নম্বর আয়াতে রিজিকের কথাও এসেছে।
আমরা অনেক সময় রিজিক বলতে শুধু টাকা, চাকরি বা ব্যবসার লাভ বুঝি। কিন্তু আল্লাহর দেওয়া রিজিক আরও বিস্তৃত।
সুস্থতা রিজিক।
ভালো পরিবার রিজিক।
শান্তিপূর্ণ ঘুম রিজিক।
নেক সন্তান রিজিক।
ভালো বন্ধু রিজিক।
ইমান রিজিক।
হালাল উপার্জনের সুযোগ রিজিক।
জ্ঞান রিজিক।
কারও বিপদে পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও রিজিক।
তাই জীবনে কিছু কম পেলে মনে করবেন না যে আল্লাহ আপনাকে রিজিক থেকে বঞ্চিত করেছেন। কখনো কখনো আল্লাহ এমন কিছু দেন, যার মূল্য আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারি না।
“যেখান থেকে কল্পনাও করেনি”—এই কথার সৌন্দর্য
আয়াতের এই অংশটি সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
আল্লাহ বলেন, তিনি বান্দাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করে না।
মানুষ সাধারণত নিজের অভিজ্ঞতার মধ্যে ভবিষ্যৎকে বিচার করে।
সে ভাবে—
“আমার পরিচিত কেউ নেই।”
“আমার কোনো সুযোগ নেই।”
“আমার টাকা নেই।”
“আমার যোগ্যতা কম।”
“আমার পরিস্থিতি খুব খারাপ।”
কিন্তু আল্লাহর সাহায্য আসার জন্য মানুষের তৈরি করা হিসাবের প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ চাইলে এমন একটি পথ খুলে দিতে পারেন, যার কথা আপনি কখনো চিন্তাই করেননি।
তাই বিপদের সময় এই আয়াত শুধু পড়বেন না, এর অর্থ হৃদয়ে ধারণ করার চেষ্টা করুন।
দোয়া কবুল মানেই কি সবসময় আমার চাওয়া জিনিস পাওয়া?
এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।
আমরা অনেক সময় ভাবি, আমি দোয়া করলাম এবং ঠিক যে জিনিসটি চেয়েছি সেটিই যদি না পাই, তাহলে হয়তো আমার দোয়া কবুল হয়নি।
এ ধারণা ঠিক নয়।
আল্লাহ আমাদের চেয়ে বেশি জানেন। আমরা ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু আল্লাহ জানেন।
কখনো বান্দা যে জিনিস চায়, সেটি তাকে দেওয়া হয়। কখনো তার চাওয়া জিনিসের পরিবর্তে অন্য কোনো কল্যাণ দেওয়া হয়। আবার কখনো কোনো বিপদ তার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
তাই দোয়া করার পর ধৈর্য ধরতে হবে।
বিপদের সময় হতাশ হওয়া যাবে না
মানুষ যখন দীর্ঘদিন কোনো সমস্যায় থাকে, তখন তার মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য হতাশা যেন তার শেষ কথা না হয়।
আপনি আজ কাঁদছেন—কিন্তু এর মানে এই নয় যে আপনার আগামীকালও কান্নায় কাটবে।
আজ আপনার হাতে কিছু নেই—এর মানে এই নয় যে আগামীকালও থাকবে না।
আজ যে মানুষ আপনাকে প্রত্যাখ্যান করেছে—এর মানে এই নয় যে আল্লাহর সাহায্যের দরজাও বন্ধ হয়ে গেছে।
আল্লাহর রহমত মানুষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না।
তাই যত কঠিন পরিস্থিতিই হোক, আল্লাহর কাছে ফিরে যান।
এই আমলের সঙ্গে ইস্তিগফারও রাখুন
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া একজন মুমিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল।
আমরা সবাই ভুল করি। জেনে বা না জেনে অনেক গুনাহ হয়ে যায়। তাই নিয়মিত ইস্তিগফার করা উচিত।
আপনি নিজের দৈনন্দিন জীবনে বলতে পারেন—
“আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি।”
তবে শুধু মুখে বলা নয়, গুনাহ থেকে ফিরে আসার আন্তরিক ইচ্ছাও থাকা দরকার।
ইস্তিগফারের মাধ্যমে মানুষ নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে এবং আল্লাহর রহমতের দিকে ফিরে যায়।
নামাজকে জীবনের কেন্দ্র বানান
কোনো আমলই নামাজের বিকল্প নয়।
আপনি যদি জীবনের কোনো কঠিন সমস্যা নিয়ে আল্লাহর সাহায্য চান, তাহলে প্রথমেই নিজের ফরজ নামাজের দিকে নজর দিন।
সময়মতো নামাজ পড়ার চেষ্টা করুন। নামাজে মনোযোগী হন। সিজদায় নিজের কথা আল্লাহর কাছে বলুন।
অনেক সময় মানুষের কাছে নিজের কষ্টের কথা বলতে বলতে আমরা ক্লান্ত হয়ে যাই। কিন্তু আল্লাহর কাছে বলতে কখনো ক্লান্ত হতে হয় না।
আপনি আপনার ভাষায় আল্লাহর কাছে বলুন—
“হে আল্লাহ, আপনি আমার অবস্থা জানেন। আমি দুর্বল, আপনি শক্তিশালী। আমি জানি না কীভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে, কিন্তু আপনি জানেন। আমার জন্য উত্তম পথ খুলে দিন।”
এই বিশ্বাস একজন মানুষের হৃদয়কে অনেকটা হালকা করে দিতে পারে।
একটি সহজ দৈনিক আমল রুটিন
যারা সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতকে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করতে চান, তারা একটি সহজ রুটিন অনুসরণ করতে পারেন।
সকালে:
- ফজরের নামাজ আদায় করুন।
- কিছু সময় কুরআন তিলাওয়াত করুন।
- সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত পড়ুন।
- নিজের ও পরিবারের জন্য দোয়া করুন।
- দিনের কাজগুলো হালাল ও সুন্দরভাবে করার নিয়ত করুন।
দিনের মধ্যে:
- কাজের ফাঁকে আল্লাহকে স্মরণ করুন।
- হারাম থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করুন।
- কারও হক নষ্ট করবেন না।
- উপার্জনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকুন।
রাতে:
- নিজের দিনের হিসাব নিন।
- কোনো ভুল হলে তওবা করুন।
- ইস্তিগফার করুন।
- আয়াত দুটির অর্থ স্মরণ করুন।
- আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ঘুমাতে যান।
এভাবে আমল করলে কুরআনের আয়াত শুধু মুখের তিলাওয়াত হয়ে থাকবে না; বরং জীবনের পথনির্দেশনায় পরিণত হবে।
একটি ভুল ধারণা থেকে সাবধান
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা অনেক সময় বিভিন্ন আমল সম্পর্কে এমন দাবি দেখি—
“এটি অমুক বার পড়লেই অমুক ফল নিশ্চিত।”
“এই আয়াত এতবার পড়লে অসম্ভব কাজ অবশ্যই হয়ে যাবে।”
“অমুক সময়ে পড়লে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যা সমাধান হবে।”
এ ধরনের দাবির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি।
কুরআনের আয়াত অবশ্যই বরকতময়। কিন্তু কোনো আয়াতকে নির্দিষ্ট সংখ্যা, নির্দিষ্ট সময় এবং নিশ্চিত পার্থিব ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করার আগে নির্ভরযোগ্য দলিল থাকা দরকার।
তাই আমরা বলতে পারি—সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াত বিপদের সময় আশা, তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলের অসাধারণ শিক্ষা দেয়।
কিন্তু এটিকে এমন কোনো যান্ত্রিক ফর্মুলা মনে করা উচিত নয় যে নির্দিষ্ট সংখ্যায় পড়লেই প্রত্যেক মানুষের প্রত্যেক অসম্ভব কাজ নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে।
আল্লাহর ওপর ভরসা করুন, কিন্তু চেষ্টা ছাড়বেন না
আপনার যদি ঋণ থাকে, তাহলে দোয়ার পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করুন।
চাকরি না থাকলে দোয়ার পাশাপাশি চাকরি খুঁজুন।
ব্যবসায় সমস্যা হলে দোয়ার পাশাপাশি ব্যবসার ভুলগুলো খুঁজে বের করুন।
পড়াশোনায় সমস্যা হলে দোয়ার পাশাপাশি পড়ার সময় বাড়ান।
সম্পর্কে সমস্যা হলে দোয়ার পাশাপাশি নিজের আচরণও সংশোধন করুন।
অর্থাৎ—
দোয়া + তাওয়াক্কুল + সঠিক চেষ্টা + তাকওয়া = একজন মুমিনের সুন্দর পথচলা।
শেষ কথা
জীবনে এমন দিন আসতেই পারে, যখন মনে হবে আর কোনো রাস্তা নেই। মনে হবে সব দরজা বন্ধ। মনে হবে নিজের শক্তি দিয়ে আর কিছু করা সম্ভব নয়।
সেই মুহূর্তে থেমে যান। একটু গভীরভাবে চিন্তা করুন।
যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি আপনার সমস্যা জানেন না?
যিনি আপনাকে এতদিন বাঁচিয়ে রেখেছেন, তিনি কি আপনার আগামীকাল জানেন না?
যিনি আপনার হৃদয়ের গোপন কথাও জানেন, তিনি কি আপনার কান্না দেখেন না?
অবশ্যই জানেন।
তাই সূরা আত-ত্বালাকের ২ ও ৩ নম্বর আয়াতকে শুধু “অসম্ভবকে সম্ভব করার আমল” হিসেবে না দেখে এর গভীর শিক্ষা নিজের জীবনে ধারণ করুন।
তাকওয়া অবলম্বন করুন।
আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করুন।
হালাল পথে চেষ্টা করুন।
নামাজ ঠিক করুন।
ইস্তিগফার করুন।
গুনাহ থেকে ফিরে আসুন।
আর আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হবেন না।
হয়তো আপনি যে দরজাটি খুঁজছেন, সেটি আপনার কল্পনার জায়গায় নেই। হয়তো আল্লাহ আপনার জন্য এমন একটি পথ তৈরি করছেন, যার কথা আপনি এখনো ভাবতেই পারছেন না।
কারণ বান্দার হিসাব সীমিত, কিন্তু আল্লাহর পরিকল্পনা সীমাহীন।
তাই আজ যদি আপনার জীবনে কোনো “অসম্ভব” সমস্যা থেকেও থাকে, আল্লাহর কাছে ফিরে যান। কুরআনের আয়াত পড়ুন, অর্থ বুঝুন, নিজের জীবন সংশোধন করুন এবং সর্বোপরি আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।”
এই একটি আশাই কখনো কখনো ভেঙে পড়া একজন মানুষকে আবার দাঁড়িয়ে যাওয়ার শক্তি দিতে পারে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাকওয়া অবলম্বন করার, তাঁর ওপর সত্যিকারের তাওয়াক্কুল করার এবং কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
