বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ ব্যাংকে টাকা রাখার বিষয়টি শুধু একটি আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের নিরাপত্তা। তাই কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হওয়ার খবর সামনে এলে স্বাভাবিকভাবেই আমানতকারীদের মনে প্রশ্ন আসে—আমার টাকা কি নিরাপদ?
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট সব ব্যাংকে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। বরং বড় একটি অংশের খেলাপি ঋণ এবং আর্থিক দুর্বলতা নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের মধ্যে বেশি কেন্দ্রীভূত। ২০২৬ সালের মার্চের তথ্য অনুযায়ী দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৫টি ব্যাংকের কাছে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৫ শতাংশ ছিল। এসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—কোনো ব্যাংককে “ঝুঁকিপূর্ণ” বলা মানেই সেই ব্যাংক আগামীকাল বন্ধ হয়ে যাবে বা আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন না—এমন নয়। ব্যাংকের প্রকৃত স্বাস্থ্য বোঝার জন্য খেলাপি ঋণ, মূলধন, প্রভিশন, তারল্য, পরিচালন দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করতে হয়।
যে ১৫টি ব্যাংক সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ও সামগ্রিক আর্থিক দুর্বলতার দিক থেকে আলোচনায় থাকা ১৫টি ব্যাংক হলো—
১. অগ্রণী ব্যাংক
২. জনতা ব্যাংক
৩. রূপালী ব্যাংক
৪. সোনালী ব্যাংক
৫. এবি ব্যাংক
৬. এক্সিম ব্যাংক
৭. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
৮. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
৯. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
১০. ইউনিয়ন ব্যাংক
১১. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ
১২. আইএফআইসি ব্যাংক
১৩. ন্যাশনাল ব্যাংক
১৪. পদ্মা ব্যাংক
১৫. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
এই তালিকাটি মূলত খেলাপি ঋণের ঘনত্ব ও ব্যাংকগুলোর আর্থিক চাপের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে এই ১৫টি ব্যাংককে দেশের সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ ধারণকারী ব্যাংক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
১. ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ
তালিকার অন্যতম আলোচিত ব্যাংক হলো ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ৯৫ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির মোট ঋণের প্রায় ৫০.৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট ঋণের অর্ধেকেরও বেশি খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে—যা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের সতর্ক সংকেত।
একসময় দেশের অন্যতম শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত এই ব্যাংকের আর্থিক চাপের পেছনে অতীতে ঋণ অনিয়ম, বড় অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং পরিচালন দুর্বলতার মতো বিষয় আলোচনায় এসেছে।
২. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের অবস্থাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের মার্চের তথ্যে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার মোট ঋণের প্রায় ৯৭.৩৯ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এত বেশি অনুপাত একটি ব্যাংকের ঋণমান ও আর্থিক সক্ষমতার ওপর বড় চাপ তৈরি করে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যাংকের আয় কমে যেতে পারে, প্রভিশনের প্রয়োজন বাড়তে পারে এবং মূলধনের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
৩. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বেশ কঠিন। মার্চ ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৭.৪৭ শতাংশে পৌঁছেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্যাংকের মোট ঋণের কতটা প্রকৃতপক্ষে ফেরত আসছে। কারণ ব্যাংকের মূল ব্যবসাই হচ্ছে আমানত নিয়ে ঋণ দেওয়া এবং সেই ঋণ থেকে আয় করা। ঋণের বড় অংশ যদি দীর্ঘদিন আটকে থাকে, তাহলে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।
৪. ইউনিয়ন ব্যাংক
ইউনিয়ন ব্যাংকও উচ্চ খেলাপি ঋণের কারণে ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে। মার্চ ২০২৬-এর তথ্যে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৯৭ শতাংশ বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতি শুধু ব্যাংকের মুনাফাকে প্রভাবিত করে না, বরং মূলধন ও তারল্য ব্যবস্থাপনাকেও কঠিন করে তোলে।
৫. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হারও অনেক বেশি। মার্চের তথ্যে এই হার প্রায় ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
একটি ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে গেলে সেই ব্যাংককে অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে হয়। কিন্তু আয় কমে গেলে সেই প্রভিশন সংরক্ষণ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সমস্যা একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে যায়।
৬. এক্সিম ব্যাংক
এক্সিম ব্যাংকও বর্তমান সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোর একটি। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৬ হাজার ৭২৪ কোটি টাকা এবং মোট ঋণের প্রায় ৬৮.৫৮ শতাংশ খেলাপি ছিল বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকের আয় এবং ভবিষ্যৎ ঋণ দেওয়ার সক্ষমতার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে।
৭. ন্যাশনাল ব্যাংক
দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোর অন্যতম ন্যাশনাল ব্যাংক। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল প্রায় ২৪ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা এবং খেলাপির হার প্রায় ৫৭ শতাংশ।
ব্যাংকটির সমস্যা শুধু খেলাপি ঋণে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘদিনের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও ঋণ অনিয়মের অভিযোগও এর আর্থিক পরিস্থিতিকে জটিল করেছে।
৮. জনতা ব্যাংক
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মধ্যেও কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে রয়েছে। জনতা ব্যাংক তাদের অন্যতম।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, সরকারি পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৭৮ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে জনতা ব্যাংকের ঘাটতিই ছিল প্রায় ৫০ হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
এটি নিঃসন্দেহে বড় একটি সতর্ক সংকেত। কারণ প্রভিশন হলো সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির বিপরীতে ব্যাংকের সুরক্ষা ব্যবস্থা।
৯. অগ্রণী ব্যাংক
অগ্রণী ব্যাংকও বড় প্রভিশন ঘাটতির মুখে রয়েছে। একই প্রতিবেদনে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ১২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের সমস্যা শেষ পর্যন্ত পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
১০. রূপালী ব্যাংক
রূপালী ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতিও বড়। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে এই ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রভিশন ঘাটতি বেশি হলে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক শক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে যখন খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে।
১১. সোনালী ব্যাংক
সোনালী ব্যাংক দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর একটি। ২০২৬ সালের মার্চের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে সোনালী ব্যাংকও দেশের ১৫টি বেশি চাপের ব্যাংকের তালিকায় ছিল।
তবে অন্যান্য কিছু ব্যাংকের মতো সোনালী ব্যাংকের পরিস্থিতিকে একই মাত্রায় ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য বোঝার জন্য আলাদা আলাদা সূচক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
১২. এবি ব্যাংক
এবি ব্যাংকও ১৫টি ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে ব্যাংকটির আর্থিক চাপের অন্যতম কারণ ছিল উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং মূলধন সংক্রান্ত দুর্বলতা।
ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—খেলাপি ঋণ কীভাবে উদ্ধার করা যায় এবং নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কীভাবে ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
১৩. আইএফআইসি ব্যাংক
আইএফআইসি ব্যাংকও আর্থিক চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোর তালিকায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতিও আলোচনায় এসেছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে এর প্রভিশন ঘাটতি প্রায় ২১ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রভিশন ঘাটতি মানেই ওই পরিমাণ টাকা সরাসরি হারিয়ে গেছে—এমন নয়। বরং ব্যাংকের সম্ভাব্য ঋণ ক্ষতির বিপরীতে যে সংরক্ষণ থাকার কথা ছিল, তার ঘাটতি বোঝায়।
১৪. পদ্মা ব্যাংক
পদ্মা ব্যাংকও দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সমস্যার মধ্যে রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চের তথ্যের ভিত্তিতে এটি দেশের ১৫টি বড় চাপের ব্যাংকের তালিকায় ছিল।
ব্যাংকটির দুর্বল আর্থিক অবস্থার কারণে পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
১৫. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক একটি বিশেষায়িত রাষ্ট্রীয় ব্যাংক। কৃষি খাতে অর্থায়নে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু খেলাপি ঋণের সামগ্রিক চাপের কারণে ব্যাংকটিও ১৫টি বেশি ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকের তালিকায় এসেছে।
এখানে মনে রাখতে হবে, কৃষি ব্যাংকের কার্যক্রমের বড় অংশ দেশের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই এই ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতা মোকাবিলাও গুরুত্বপূর্ণ।
কেন বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো এত ঝুঁকিতে পড়ল?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। বছরের পর বছর ধরে জমতে থাকা খেলাপি ঋণ, ঋণ অনুমোদনে দুর্বলতা, অনিয়ম, দুর্বল কর্পোরেট গভর্ন্যান্স, প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের চাপ এবং পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি—সবকিছু মিলেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ব্যাংকের মূল ব্যবসা খুব সহজভাবে বললে—মানুষের কাছ থেকে আমানত নেওয়া, সেই অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া এবং ঋণের সুদ ও অন্যান্য আয় থেকে ব্যাংকের খরচ ও মুনাফা পরিচালনা করা। কিন্তু ঋণ ফেরত না এলে পুরো হিসাব বদলে যায়।
একটি ঋণ খেলাপি হলে ব্যাংককে তার বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। খেলাপি ঋণ যত বাড়ে, প্রভিশনের প্রয়োজনও তত বাড়ে। আর প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের মুনাফা কমে যায়। মুনাফা কমলে মূলধন বাড়ানোর সক্ষমতা কমে। এরপর মূলধন দুর্বল হলে ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও চাপের মুখে পড়ে।
এভাবেই একটি সমস্যা ধীরে ধীরে বড় আর্থিক সংকটে পরিণত হতে পারে।
খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চিত্র
২০২৬ সালের জুন শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। এটি মোট ঋণের প্রায় ৩২.৭৮ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১০০ টাকা ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৩ টাকা খেলাপি।
এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এর পেছনে রয়েছে ব্যাংকের আটকে থাকা অর্থ, কমে যাওয়া আয়, বাড়তে থাকা প্রভিশন এবং আমানতকারীদের আস্থার প্রশ্ন।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খেলাপি ঋণের বড় অংশ কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত। মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ১৫টি ব্যাংক দেশের প্রায় ৮৫ শতাংশ খেলাপি ঋণ ধারণ করছিল।
অর্থাৎ পুরো ব্যাংকিং খাত একই অবস্থায় নেই। কিছু ব্যাংক তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকলেও কয়েকটি ব্যাংকের সংকট পুরো খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে।
শুধু লোকসান নয়, মূলধন ঘাটতিও বড় সমস্যা
২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল এবং এসব ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। একই সময়ে পুরো ব্যাংক খাতের নিট মূলধন ঘাটতি ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা।
এখানে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা দরকার।
ব্যাংকের মূলধন হলো এক ধরনের আর্থিক সুরক্ষা। কোনো ঋণ থেকে ক্ষতি হলে সেই ক্ষতি সামলাতে মূলধন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু মূলধন যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে ব্যাংকের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়।
আমানতকারীদের কি ভয় পাওয়ার কারণ আছে?
এই প্রশ্নটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো ব্যাংকের আর্থিক দুর্বলতার খবর দেখে আতঙ্কিত হয়ে রাতারাতি সব টাকা তুলে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কোনো ব্যাংকের সমস্যা নিয়ে একেবারেই চিন্তা না করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আমানতকারী হিসেবে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা যেতে পারে—
- ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য দেখুন।
- অস্বাভাবিক বেশি সুদের লোভে শুধু সুদের হার দেখে ব্যাংক নির্বাচন করবেন না।
- দীর্ঘমেয়াদি বড় সঞ্চয় হলে ঝুঁকি এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না করার বিষয়টি বিবেচনা করুন।
- ব্যাংকের তারল্য, খেলাপি ঋণ ও মূলধনের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিন।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেবেন না।
- প্রয়োজন হলে ব্যাংকের অফিসিয়াল কর্তৃপক্ষ বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—একটি সংবাদে কোনো ব্যাংককে “ধ্বংস হয়ে গেছে” ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবার ব্যাংকের সমস্যার খবরকে সম্পূর্ণ উপেক্ষাও করা উচিত নয়।
সংকট কাটাতে কী করছে বাংলাদেশ ব্যাংক?
বাংলাদেশ ব্যাংকও পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালে খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি মধ্যমেয়াদি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, সম্পদের মান যাচাই, ঋণ পুনরুদ্ধার, মূলধন পুনর্গঠন এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় রয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন ও আমানত সুরক্ষা কাঠামোর মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক মোকাবিলা এবং সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার জন্যও নতুন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য শুধু সাময়িকভাবে ব্যাংকে টাকা ঢেলে সংকট ঠেকানো নয়; বরং খেলাপি ঋণের মূল সমস্যা সমাধান করা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রকৃত খেলাপি ঋণ উদ্ধার করা। শুধু ঋণ পুনঃতফসিল বা সময় বাড়িয়ে দিলে সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান হয় না। যে ঋণগ্রহীতা সত্যিই ব্যবসায়িক সমস্যায় পড়েছেন এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম—তাকে সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ পরিশোধ না করা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
কারণ দীর্ঘদিন ধরে যদি মানুষ মনে করে ঋণ নিলেও তা ফেরত না দিলেও বড় কোনো সমস্যা হবে না, তাহলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরাও খেলাপি ঋণকে বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলেছে, বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি তৈরি করে আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
শেষ কথা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত নিঃসন্দেহে একটি কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৫টি ব্যাংকে দেশের বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া, একাধিক ব্যাংকের লোকসান, প্রভিশন ঘাটতি এবং মূলধন সংকট—এসব বিষয় সাধারণ মানুষের জন্য সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ।
তবে আতঙ্কিত হওয়ারও প্রয়োজন নেই। কারণ ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রক পদক্ষেপ নিচ্ছে এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্য বিভিন্ন পুনর্গঠন ও তারল্য সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে।
একই সঙ্গে আমানতকারীদেরও সচেতন হতে হবে। শুধু পরিচিত নাম, বেশি মুনাফা বা আকর্ষণীয় অফার দেখে ব্যাংকে টাকা রাখার দিন শেষ। এখন ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্য, সুশাসন, খেলাপি ঋণ এবং মূলধনের অবস্থাও বিবেচনা করা জরুরি।
সবশেষে মনে রাখা দরকার—ব্যাংকের নামের তালিকা দেখে আতঙ্কিত না হয়ে তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আর কোনো ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সর্বশেষ বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য যাচাই করা জরুরি, কারণ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে।
২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী এই ১৫টি ব্যাংক সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে থাকা ব্যাংকগুলোর একটি বড় অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে; কিন্তু এটিকে কোনো ব্যাংক ভবিষ্যতে বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সমস্যাগুলো কতটা গভীর হয়েছে, তার একটি সতর্ক সংকেত।
