আজ ১২ রবিউল আউয়াল। বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪৮ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল উপলক্ষে ২৬ আগস্ট ২০২৬ ঈদে মিলাদুন্নবী ﷺ পালিত হচ্ছে। এই দিনটি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর জন্ম ও তাঁর মহান জীবন-আদর্শ স্মরণের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন আল্লাহর সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তিনি শুধু আরবের মানুষের জন্য নয়, সমগ্র মানবজাতি ও সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
অর্থ: “আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” —সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:১০৭।
তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন আলোচনা মানে শুধু একটি ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের জীবনী আলোচনা নয়; বরং ঈমান, মানবতা, ন্যায়, দয়া, চরিত্র, ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের সর্বোত্তম আদর্শকে স্মরণ করা।
মহানবী ﷺ কেন শ্রেষ্ঠ?
আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য নবী ও রাসুলকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। প্রত্যেক নবীই ছিলেন সম্মানিত ও মর্যাদাবান। তবে মুহাম্মদ ﷺ হলেন সর্বশেষ নবী এবং তাঁর মাধ্যমে নবুয়তের ধারার সমাপ্তি হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই বলেছেন—
“কিয়ামতের দিন আমি আদম-সন্তানদের নেতা হব; আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর বিদীর্ণ হবে, আমিই প্রথম সুপারিশকারী এবং আমার সুপারিশই প্রথম গ্রহণ করা হবে।”
—সহিহ মুসলিম, ২২৭৮।
এই হাদিস রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অসাধারণ মর্যাদার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। তিনি কিয়ামতের দিন সমগ্র মানবজাতির সামনে বিশেষ মর্যাদা লাভ করবেন এবং তাঁর শাফাআত আল্লাহর অনুমতিতে কবুল হবে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে—রাসুল ﷺ-এর মর্যাদা যতই মহান হোক, তিনি আল্লাহ নন; তিনি আল্লাহর বান্দা ও রাসুল। মুসলমানের ঈমান হলো, আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই এবং মুহাম্মদ ﷺ তাঁর বান্দা ও শেষ রাসুল।
তিনি ছিলেন সমগ্র জগতের রহমত
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অসীম দয়া ও মমতা।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে বলেছেন “রহমাতুল্লিল আলামিন”—সমগ্র জগতের জন্য রহমত।
তিনি এতিমের প্রতি দয়া করেছেন, দরিদ্রের পাশে দাঁড়িয়েছেন, অসহায়কে সাহায্য করেছেন, প্রতিবেশীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন, নারীর মর্যাদা রক্ষা করেছেন এবং দাস-দাসীদের প্রতি মানবিক আচরণের শিক্ষা দিয়েছেন।
শুধু মানুষের প্রতিই নয়, পশুপাখির প্রতিও দয়া করার শিক্ষা দিয়েছেন। একটি প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকেও তিনি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছেন।
আজ আমরা যদি সত্যিই রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসি, তাহলে আমাদের আচরণেও সেই রহমতের প্রকাশ ঘটতে হবে। পরিবারে রাগ, সমাজে বিদ্বেষ, প্রতিবেশীর সঙ্গে ঝগড়া, দুর্বলকে অপমান—এসব রেখে শুধু মুখে ভালোবাসার দাবি যথেষ্ট নয়।
তাঁর চরিত্র ছিল সর্বোত্তম
হযরত আয়েশা (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেছিলেন—
“তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।”
অর্থাৎ কুরআনের শিক্ষা তাঁর জীবনে বাস্তব রূপ লাভ করেছিল।
আল্লাহ তায়ালা তাঁর সম্পর্কে বলেছেন—
وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ
অর্থ: “নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।”
—সূরা আল-কলম, ৬৮:৪।
রাসুল ﷺ ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার, বিনয়ী, ক্ষমাশীল ও ন্যায়পরায়ণ। নবুয়ত লাভের আগেও মক্কার মানুষ তাঁকে আল-আমিন—বিশ্বস্ত—নামে ডাকত।
আজকের সমাজে যদি তাঁর চরিত্রের সামান্য অংশও বাস্তবায়িত করা যায়, তাহলে পরিবার, ব্যবসা, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব ক্ষেত্রেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
শত্রুর প্রতিও ক্ষমাশীলতা
মক্কা বিজয়ের ঘটনা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ক্ষমাশীলতার অন্যতম উজ্জ্বল উদাহরণ।
যে মানুষগুলো তাঁকে এবং তাঁর সাহাবিদের বছরের পর বছর নির্যাতন করেছিল, দেশত্যাগে বাধ্য করেছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল—মক্কা বিজয়ের দিন তিনি চাইলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নিতে পারতেন।
কিন্তু তিনি প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার পথ বেছে নেন।
এটাই ছিল তাঁর মহান চরিত্র।
আমরা সামান্য অপমান সহ্য করতে পারি না। কেউ একটি কথা বললেই সম্পর্ক নষ্ট করি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য মতবিরোধ হলেই গালাগালি শুরু করি। অথচ আমাদের প্রিয় নবী ﷺ শত্রুর প্রতিও ক্ষমা ও দয়ার অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
তাঁর ভালোবাসা ছিল উম্মতের জন্য
রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর উম্মতের জন্য অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন। মানুষের হেদায়েত ও মুক্তির জন্য তিনি দিনরাত চেষ্টা করেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“তোমাদের কাছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল এসেছেন; তোমাদের কষ্ট তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণকামী এবং মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল, পরম দয়ালু।”
—সূরা আত-তাওবা, ৯:১২৮।
এ আয়াত আমাদের বুঝিয়ে দেয়, রাসুল ﷺ উম্মতের কল্যাণের ব্যাপারে কতটা উদ্বিগ্ন ছিলেন।
তিনি শুধু নিজের যুগের মানুষের জন্য কাজ করেননি; কিয়ামত পর্যন্ত আগত উম্মতের জন্যও দ্বীনের পূর্ণাঙ্গ পথ রেখে গেছেন।
রাসুল ﷺ-কে ভালোবাসা ঈমানের অংশ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান ও সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।”
—সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম।
অর্থাৎ রাসুল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসার প্রমাণ কী?
রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা।
তিনি নামাজ পড়েছেন—আমরা নামাজ কায়েম করব।
তিনি সত্য বলেছেন—আমরা সত্য বলব।
তিনি আমানত রক্ষা করেছেন—আমরা আমানত রক্ষা করব।
তিনি ক্ষমা করেছেন—আমরাও ক্ষমা করার চেষ্টা করব।
তিনি প্রতিবেশীর অধিকার দিয়েছেন—আমরাও প্রতিবেশীর প্রতি সদয় হব।
তিনি গরিবের পাশে দাঁড়িয়েছেন—আমরাও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব।
তাঁর প্রতি দরুদ পাঠ
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম সুন্দর আমল হলো দরুদ পাঠ করা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করো।”
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬।
তাই বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা উচিত। বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নাম উচ্চারিত হলে তাঁর প্রতি সালাম ও দরুদ পাঠ করা মুসলমানের ভালোবাসা ও আদবের অংশ।
১২ রবিউল আউয়ালের শিক্ষা কী?
এই দিনকে কেন্দ্র করে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হওয়া উচিত—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জীবনকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
শুধু আলোচনা, বক্তৃতা, পোস্ট বা আবেগের মধ্যে তাঁর ভালোবাসাকে সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করতে হবে।
আজ আমরা অন্তত কয়েকটি সংকল্প করতে পারি—
১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত আদায় করব।
২. প্রতিদিন কুরআন পড়ব ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করব।
৩. রাসুল ﷺ-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করব।
৪. মিথ্যা, প্রতারণা ও গিবত থেকে বেঁচে থাকব।
৫. বাবা-মায়ের সঙ্গে উত্তম আচরণ করব।
৬. স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের সঙ্গে কোমল আচরণ করব।
৭. গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব।
৮. প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করব।
৯. রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করব।
১০. রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহ সম্পর্কে শিখব এবং তা অনুসরণ করার চেষ্টা করব।
মিলাদুন্নবী উপলক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য
১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জন্ম স্মরণ, দরুদ, আলোচনা ও সীরাত পাঠের বিভিন্ন রীতি প্রচলিত রয়েছে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদও রয়েছে—বিশেষ করে নির্দিষ্টভাবে “ঈদ” হিসেবে পালন করার শরয়ি বিধান নিয়ে।
তাই এ দিনকে ঘিরে মুসলমানদের উচিত পরস্পরকে গালি বা অপমান না করে কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জ্ঞান অর্জন করা এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে শরিয়তসম্মত আমলকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
রাসুল ﷺ-এর জন্মতারিখ নিয়েও ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন মত পাওয়া যায়। বাংলাদেশে ১৪৪৮ হিজরির ১২ রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে সরকারি সিদ্ধান্তে ২৬ আগস্ট ২০২৬ ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে দিনটি পালন করা হচ্ছে।
শেষ কথা
মহানবী মুহাম্মদ ﷺ ছিলেন মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান রহমত। তাঁর জীবন ছিল কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাঁর চরিত্র ছিল উত্তম, তাঁর হৃদয় ছিল উম্মতের জন্য কোমল, তাঁর দাওয়াত ছিল তাওহিদের দিকে এবং তাঁর আদর্শ ছিল কিয়ামত পর্যন্ত মানবজাতির জন্য পথনির্দেশ।
সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজের মর্যাদা সম্পর্কে বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিনি আদম-সন্তানদের নেতা হবেন এবং প্রথম শাফাআতকারী হবেন।
তাই ১২ রবিউল আউয়াল শুধু আনন্দের দিন হিসেবে নয়, নিজেকে রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহর পথে ফিরিয়ে আনার দিন হিসেবেও গ্রহণ করা উচিত।
আমরা যদি সত্যিই তাঁকে ভালোবাসি, তাহলে আমাদের নামাজে তাঁর শিক্ষা থাকবে, কথায় তাঁর সত্যবাদিতা থাকবে, আচরণে তাঁর দয়া থাকবে, পরিবারে তাঁর কোমলতা থাকবে, ব্যবসায় তাঁর আমানতদারি থাকবে এবং সমাজে তাঁর ন্যায়বিচার থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর সত্যিকারের উম্মত হিসেবে কবুল করুন, তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দিন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর শাফাআত নসিব করুন।
اللهم صل وسلم وبارك على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ ﷺ।
আমিন।
