জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ কী? কেউ বলবেন টাকা, কেউ বলবেন বাড়ি-গাড়ি, আবার কেউ বলবেন জমিজমা কিংবা সামাজিক মর্যাদা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সুস্থ শরীরের চেয়ে বড় সম্পদ আর কিছুই হতে পারে না। অথচ আজকের পৃথিবীতে সুস্থ থাকার জন্যই মানুষকে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। একসময় মানুষ অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে যেত সুস্থ হওয়ার আশায়। আর এখন অনেক মানুষ চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে হিসাব করেন, চিকিৎসা করাতে গেলে সংসার কীভাবে চলবে, সন্তানের পড়াশোনার খরচ কোথা থেকে আসবে, কিংবা ধারদেনা করে চিকিৎসা করানোর পর সেই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন।
চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। একজন মানুষ অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিৎসা এখন অনেক পরিবারের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষদের কাছে বড় কোনো রোগের চিকিৎসা মানেই যেন জীবনের সমস্ত সঞ্চয় শেষ হয়ে যাওয়া। কেউ জমি বিক্রি করছেন, কেউ বাড়ির শেষ সম্বলটুকু বন্ধক রাখছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পাতছেন, আবার কেউ ঋণ নিয়ে হাসপাতালের বিল পরিশোধ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঞ্চয় কয়েক দিনের হাসপাতালেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, একজন মানুষ যখন অসুস্থ হন, তখন শুধু তার শরীরই অসুস্থ হয় না; অসুস্থ হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হলে সংসারের আয় বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে চিকিৎসার খরচ বাড়তে থাকে প্রতিদিন। ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের ফি, হাসপাতালের বেড ভাড়া, অপারেশন, যাতায়াত ও রোগীর খাবার—সব মিলিয়ে একটি পরিবারকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
আজ পৃথিবীর বহু দেশে চিকিৎসার ব্যয় মানুষের দারিদ্র্যের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যসেবার জন্য মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে ব্যয়ের কারণে আর্থিক বিপর্যয় এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। অর্থাৎ চিকিৎসা নিতে গিয়ে মানুষ শুধু অর্থ ব্যয় করছেন না, অনেকেই নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তাও হারাচ্ছেন। যে অর্থ দিয়ে একটি পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে পারত, বাড়ি নির্মাণ করতে পারত কিংবা জীবনের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারত, সেই অর্থ চলে যাচ্ছে হাসপাতালের বিল আর ওষুধের পেছনে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও বেশি উদ্বেগজনক
বাংলাদেশের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। আমাদের দেশে অধিকাংশ পরিবারের চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হয় নিজেদের পকেট থেকে। সরকারি হাসপাতাল থাকলেও রোগীর চাপ, শয্যাসংকট, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে দীর্ঘ অপেক্ষা এবং নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে যান। সেখানে চিকিৎসার খরচ অনেক পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩১ শতাংশ এসেছে মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবার পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার বড় অংশই সাধারণ মানুষকে নিজের আয়, সঞ্চয় কিংবা ধারদেনা থেকে বহন করতে হয়। এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য যেমন উদ্বেগের বিষয়, তেমনি সাধারণ মানুষের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
২০২৬ সালে প্রকাশিত BMJ Open-এর একটি গবেষণায় বাংলাদেশের ২০২২ সালের জাতীয় খানা আয় ও ব্যয় জরিপের ১৪ হাজার ৩৯৫টি পরিবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০২২ সালে চিকিৎসার পেছনে নিজের পকেট থেকে অর্থ ব্যয়ের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৬১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে গেছেন। একই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১৭.৭২ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ভোগব্যয়ের ১০ শতাংশের বেশি স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করেছে। অন্যভাবে বললে, চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে বহু পরিবার তাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় ব্যয় সংকুচিত করতে বাধ্য হয়েছে।
একবার ভাবুন, এই ৬১ লাখ মানুষের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একটি করে পরিবার, সন্তান, স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম। কেউ হয়তো মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা জমিয়েছিলেন, কেউ ছেলের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচের জন্য সঞ্চয় করছিলেন, কেউ আবার ছোট একটি বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু পরিবারের কারও অসুস্থতার কারণে সেই সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে। শুধু অর্থনৈতিক হিসাব দিয়ে এসব ক্ষতির গভীরতা বোঝা সম্ভব নয়।
চিকিৎসা করাতে গিয়ে কেনো নিঃস্ব হচ্ছে মানুষ?
প্রথম কারণ হলো চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। একজন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর শুধু চিকিৎসকের ফি দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। একের পর এক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসাসামগ্রীর জন্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক সময় রোগী ও তার স্বজনেরা বুঝতেই পারেন না, কোন পরীক্ষাটি কেন প্রয়োজন এবং এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা আছে কি না।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা একটি পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ, হৃদরোগ, ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হয়। প্রতিদিনের ওষুধ, নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হয়। এক মাসের চিকিৎসার খরচ হয়তো কোনোভাবে বহন করা সম্ভব, কিন্তু বছরের পর বছর সেই খরচ চালিয়ে যাওয়া অনেক পরিবারের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
তৃতীয়ত, চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর স্বজনদেরও নানা খরচ বহন করতে হয়। গ্রামের কোনো রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে এলে শুধু হাসপাতালের খরচ নয়, যাতায়াত, থাকা, খাওয়া এবং রোগীর দেখাশোনার জন্য একজন বা একাধিক মানুষের সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। অনেক সময় পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকেও কাজ বন্ধ রেখে হাসপাতালে থাকতে হয়। ফলে একদিকে আয় কমে যায়, অন্যদিকে ব্যয় বেড়ে যায়। এই দুইয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে পরিবারটি ঋণের মধ্যে ডুবে যায়।
চতুর্থত, জরুরি চিকিৎসার জন্য মানুষের হাতে পর্যাপ্ত সঞ্চয় থাকে না। বাংলাদেশের অধিকাংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার মাসের আয় দিয়ে মাসের খরচ চালায়। বাসাভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ বিল, সন্তানের পড়াশোনা, যাতায়াত এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর খুব বেশি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব হয় না। হঠাৎ পরিবারের কেউ স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, দুর্ঘটনা কিংবা অন্য কোনো জটিল রোগে আক্রান্ত হলে সেই পরিবার কোথা থেকে লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করবে? তখন ধারদেনা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না।
মধ্যবিত্ত পরিবারের কষ্টটা একটু আলাদা
দারিদ্র্যের কষ্ট যেমন কঠিন, মধ্যবিত্ত পরিবারের চিকিৎসার খরচের চাপও অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে। কারণ মধ্যবিত্ত মানুষ অনেক সময় নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে পারেন না। তারা আত্মীয়স্বজনের কাছে হাত পাততে চান না, আবার নিজেদের আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সব চিকিৎসার খরচও বহন করতে পারেন না।
একজন মধ্যবিত্ত বাবা হয়তো নিজের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যেতে চাইছেন না। কারণ তিনি জানেন, তার চিকিৎসায় কয়েক লাখ টাকা খরচ হলে সন্তানের পড়াশোনার টাকা বন্ধ হয়ে যাবে। একজন মা হয়তো দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা সহ্য করছেন, কিন্তু পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা চিন্তা করে চিকিৎসা করাচ্ছেন না। আবার কোনো পরিবারে সন্তান অসুস্থ হলে বাবা-মা নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করে হলেও সন্তানের চিকিৎসা করানোর চেষ্টা করেন।
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, অনেক মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসা নিতে দেরি করেন শুধু টাকার অভাবে। প্রাথমিক অবস্থায় যে রোগের চিকিৎসা তুলনামূলক কম খরচে সম্ভব ছিল, অবহেলা ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সেই রোগ জটিল হয়ে ওঠে। পরে চিকিৎসার খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ অর্থের অভাবে চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া অনেক সময় রোগীর জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়।
ঋণ, জমি বিক্রি এবং শেষ সম্বল হারানোর গল্প
আমাদের সমাজে এমন ঘটনা নতুন নয়। পরিবারের কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয়। কিডনি রোগীর ডায়ালাইসিস চালিয়ে যেতে গিয়ে পরিবারের শেষ সঞ্চয়টুকুও শেষ হয়ে যায়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তির অপারেশনের জন্য গ্রামের জমি বিক্রি করতে হয়। কেউ আবার ব্যাংক বা বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেন।
চিকিৎসা শেষ হওয়ার পরও কিন্তু সেই পরিবারের সংগ্রাম শেষ হয় না। বরং তখন শুরু হয় নতুন যুদ্ধ। হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে গিয়ে যে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, সেটি কীভাবে শোধ হবে? যে জমি বিক্রি করা হয়েছে, সেটি আবার কীভাবে কেনা সম্ভব হবে? যে সঞ্চয় শেষ হয়ে গেছে, সেটি নতুন করে গড়ে তোলার সামর্থ্য কোথায়?
অনেক পরিবার চিকিৎসার জন্য ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর সেই ঋণ পরিশোধ করে। পরিবারের একজন সদস্য সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও অন্য সদস্যদের জীবন থেকে স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়। সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, পরিবারের পুষ্টিকর খাবার কমে যায়, প্রয়োজনীয় পোশাক কেনা বন্ধ হয়। এমনকি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে পরিবারের অন্য কোনো সদস্যের চিকিৎসাও পিছিয়ে দিতে হয়।
এভাবে একটি অসুস্থতা শুধু একজন মানুষকে নয়, পুরো পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।
শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো পৃথিবীর জন্যই এটি বড় সংকট
চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে মানুষের আর্থিক দুরবস্থা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশ—বিভিন্ন জায়গায় মানুষ স্বাস্থ্যসেবার খরচ নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ চিকিৎসার ব্যয়ের কারণে নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন অথবা আগে থেকেই দরিদ্র থাকা অবস্থায় আরও দরিদ্র হয়েছেন। World Bank
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের আর্থিক সুরক্ষাবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে পৃথিবীর প্রায় ২১০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার নিজস্ব ব্যয়জনিত আর্থিক সংকটে ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ চিকিৎসার খরচের কারণে আরও দরিদ্র হয়েছেন অথবা দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছেন। World Health Organization
এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি। চিকিৎসার জন্য অর্থ ব্যয় করলেই একজন মানুষ দরিদ্র হয়ে যান, বিষয়টি এমন নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে তাকে খাবার, বাসস্থান, শিক্ষা কিংবা জীবনের অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজনের অর্থ কমিয়ে দিতে হয়। অর্থাৎ চিকিৎসার বিল পরিশোধ করতে গিয়ে যখন পরিবারের স্বাভাবিক জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেটি আর সাধারণ ব্যয় থাকে না; সেটি আর্থিক বিপর্যয়ে পরিণত হয়।
ওষুধের দাম ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়ও বড় কারণ
চিকিৎসার খরচের একটি বড় অংশ চলে যায় ওষুধ কেনার পেছনে। অনেক রোগীকে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক ওষুধ সেবন করতে হয়। কোনো কোনো ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়মিত ওষুধ কেনা একটি বড় আর্থিক চাপ।
এর সঙ্গে রয়েছে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয়। অনেক রোগীকে চিকিৎসার প্রয়োজনে একাধিকবার একই ধরনের পরীক্ষা করাতে হয়। কখনো এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়, কখনো পুরোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় নতুন করে পরীক্ষা করাতে হয়। এতে রোগীর পরিবারের অর্থ ও সময় দুটোই নষ্ট হয়।
অবশ্য চিকিৎসকের পরামর্শে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে চিকিৎসাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, যুক্তিসংগত মূল্য নির্ধারণ এবং রোগীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।
তাহলে এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী?
প্রথমত, সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন কম খরচে মানসম্মত চিকিৎসা পান, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রয়োজনীয় ওষুধ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং রোগীর জন্য পর্যাপ্ত শয্যা থাকতে হবে। শুধু হাসপাতাল নির্মাণ করলেই হবে না, সেখানে প্রয়োজনীয় সেবার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যবিমা বা সামাজিক স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। একজন মানুষ অসুস্থ হওয়ার পর যেন চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নিজের জমি, বাড়ি কিংবা শেষ সম্বল বিক্রি করতে বাধ্য না হন, সে জন্য আগে থেকেই আর্থিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যবিমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তৃতীয়ত, ওষুধ ও চিকিৎসাসেবার মূল্য নির্ধারণে কার্যকর নজরদারি থাকতে হবে। হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং ওষুধের বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। রোগীকে কোন পরীক্ষাটি কেন করানো হচ্ছে, কী চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং মোট খরচ কত হতে পারে, তা পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত।
চতুর্থত, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সুষম খাবার, শারীরিক পরিশ্রম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান পরিহার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে অনেক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তবে মনে রাখতে হবে, সব রোগ প্রতিরোধ করা যায় না এবং অসুস্থতার দায় কখনো রোগীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়।
পঞ্চমত, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। সব রোগীকে যেন ছোটখাটো চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছুটতে না হয়। নিজ নিজ এলাকায় প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা এবং জরুরি চিকিৎসা পাওয়া গেলে মানুষের যাতায়াত ও থাকার খরচ অনেকটাই কমে আসবে।
সুস্থ থাকার অধিকার যেন শুধু ধনীদের জন্য না হয়
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু তার বড় বড় ভবন, উন্নত রাস্তা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে হয় না। সেই সমাজের সাধারণ মানুষ অসুস্থ হলে কত সহজে চিকিৎসা পায়, সেটিও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
একজন ধনী মানুষ অসুস্থ হলে হয়তো দেশের সেরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন। প্রয়োজনে বিদেশে চলে যেতে পারেন। কিন্তু একজন দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা স্বল্প আয়ের কর্মজীবী মানুষ কী করবেন? তার কাছে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করাটাই যখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, তখন সুস্থ হওয়ার স্বপ্ন দেখাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন বাবার কাছে সন্তানের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় কিছু নেই। একজন সন্তানের কাছে মায়ের চিকিৎসার চেয়ে জরুরি কিছু নেই। কিন্তু সেই চিকিৎসা যদি সামর্থ্যের বাইরে চলে যায়, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে? জীবন বাঁচানোর জন্য মানুষের কাছে অর্থ থাকা প্রয়োজন, নাকি অর্থ না থাকলেও জীবন বাঁচানোর সুযোগ থাকা উচিত?
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকার বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নয়, পুরো সমাজের ভাবনার বিষয়।
আমরা এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা চাই, যেখানে একজন মানুষ অসুস্থ হলে তাকে প্রথমে নিজের ব্যাংক ব্যালান্সের কথা ভাবতে হবে না। যেখানে চিকিৎসা নিতে গিয়ে কোনো পরিবারকে জমি বিক্রি করতে হবে না, সন্তানকে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিতে হবে না কিংবা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে না।
কারণ অসুস্থতা কোনো মানুষের পছন্দ নয়। গরিব হওয়াও কোনো অপরাধ নয়। একজন মানুষ দরিদ্র হতে পারেন, কিন্তু সেই কারণে তার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার কমে যেতে পারে না।
সবচেয়ে বড় কথা, চিকিৎসা মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। এটি কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো শখ নয়, কোনো ঐচ্ছিক খরচও নয়। তাই চিকিৎসাকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
একটি কথা মনে রাখা দরকার—মানুষ সারাজীবন অর্থ উপার্জন করে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য। কিন্তু সেই বেঁচে থাকার জন্যই যদি শেষ পর্যন্ত তার সমস্ত অর্থ শেষ হয়ে যায়, তাহলে সেই উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কোথায়?
যে দেশে মানুষ চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে গরিব হয়ে যায়, সেই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
আপনার মতামত কী? চিকিৎসার ব্যয় কমাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত কোন বিষয়টিতে—সরকারি হাসপাতালের উন্নয়ন, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, নাকি সবার জন্য স্বাস্থ্যবিমা?
তথ্যসূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্বব্যাংক এবং BMJ Open-এ প্রকাশিত বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যয় ও দারিদ্র্যবিষয়ক গবেষণা।
