ভবিষ্যতে কী এমন পরিস্থিতি হতে পারে? যার জন্য খাবার-পানি মজুদ করতে বলেছেন বিভিন্ন দেশ।

ভাবুন তো, এমন একটি সময়ের কথা, যখন আপনার হাতে পর্যাপ্ত টাকা আছে, ব্যাংকে সঞ্চয় আছে, ঘরে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার সামর্থ্যও আছে, অথচ বাজারে গিয়ে আপনি চাইলেও এক বোতল পানি কিংবা এক প্যাকেট খাবার কিনতে পারছেন না! দোকান খোলা থাকলেও পণ্য নেই, সুপারশপের তাকগুলো খালি, জ্বালানি সংকটে পরিবহন বন্ধ, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল। চারদিকে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে সেই পরিবার, যারা প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় খাবার ও পানির জন্য সম্পূর্ণভাবে বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

শুনতে হয়তো কোনো সিনেমার গল্পের মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এখন নাগরিকদের জরুরি পরিস্থিতির জন্য বাড়িতে কিছুদিনের খাবার, পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী সংরক্ষণ করার পরামর্শ দিচ্ছে। এর অর্থ এই নয় যে, আগামীকালই পৃথিবীতে ভয়াবহ কোনো বিপর্যয় নেমে আসবে। বরং সরকারগুলো বুঝতে পারছে, আধুনিক পৃথিবী যত উন্নত হচ্ছে, আমাদের দৈনন্দিন জীবন তত বেশি বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, পরিবহন, জ্বালানি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এই ব্যবস্থাগুলোর যেকোনো একটিতে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব খুব দ্রুত সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছে যেতে পারে।

প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে এমন কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যার কথা মাথায় রেখে বিভিন্ন দেশের সরকার মানুষকে খাবার ও পানি মজুদ রাখার পরামর্শ দিচ্ছে? বিষয়টি আতঙ্কের নয়, বরং সচেতন হওয়ার মতো। কারণ বিপদ কখন আসবে, তা আমরা জানি না; কিন্তু বিপদের সময় কীভাবে নিজেদের পরিবারকে নিরাপদ রাখব, সেই প্রস্তুতি আগে থেকেই নেওয়া সম্ভব।

🌿 কেন হঠাৎ খাবার ও পানির সংকট তৈরি হতে পারে?

আমরা সাধারণত মনে করি, পৃথিবীতে খাবারের অভাব হবে তখনই, যখন ফসল উৎপাদন কমে যাবে অথবা বড় ধরনের দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। কিন্তু বাস্তবে খাদ্যসংকট তৈরি হওয়ার জন্য শুধু ফসলের অভাবই দায়ী নয়। খাবার উৎপাদিত হওয়ার পর সেটি মানুষের ঘরে পৌঁছানোর জন্য অনেকগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। কৃষককে সার, বীজ, ডিজেল ও বিদ্যুৎ পেতে হয়। খাদ্যপণ্য কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়, ট্রাকে করে বাজারে আসে, গুদামে সংরক্ষিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত দোকানে পৌঁছায়। এই পুরো ব্যবস্থার যেকোনো একটি জায়গায় বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে বাজারে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

ধরুন, কোনো কারণে কয়েক দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকল। তখন শুধু আপনার বাসার ফ্যান, লাইট কিংবা ফ্রিজ বন্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, খাদ্য সংরক্ষণাগার, সুপারশপ, ব্যাংক, মোবাইল নেটওয়ার্ক এবং শিল্পকারখানায়। অনেক খাবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং নগদ টাকা উত্তোলন করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের মানুষ তখন সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে পারেন। কারণ শহরের অধিকাংশ পরিবার নিজেরা খাবার উৎপাদন করে না। প্রতিদিন বাজার থেকে কেনা খাবারের ওপর তাদের জীবন নির্ভর করে।

এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, আধুনিক পৃথিবীর খাদ্যব্যবস্থা অনেকটাই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক, জাহাজ ও বিমান খাদ্যপণ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। এই যোগাযোগব্যবস্থা যদি কোনো কারণে দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়, তাহলে অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

১. তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা বড় ধরনের সামরিক সংঘাত

বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে আলোচিত আশঙ্কাগুলোর একটি হলো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক যুদ্ধ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা, সীমান্ত বিরোধ, সামরিক প্রতিযোগিতা এবং পরাশক্তিগুলোর মধ্যে বিরোধ রয়েছে। কোনো একটি আঞ্চলিক সংঘাত যদি বড় আকার ধারণ করে, তাহলে তার প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ, খাদ্যপণ্যের বাজার এবং পরিবহনব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, বন্দর কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুট বন্ধ হয়ে গেলে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে যায়। অনেক দেশ জ্বালানি, গম, ভোজ্যতেল, সার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের কারণে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পণ্য পাওয়া নিয়েও সংকট তৈরি হতে পারে।

ইউরোপের দেশগুলো এই বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের Preparedness Union Strategy প্রকাশ করে। সেখানে সাধারণ মানুষকে এমনভাবে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়, যাতে কোনো বড় সংকট দেখা দিলে অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেরা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে চলতে পারেন। সম্ভাব্য যুদ্ধ, সাইবার হামলা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি পরিস্থিতিকে এই প্রস্তুতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিশ্চিতভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস দিয়েছে। বরং যুদ্ধের ঝুঁকি ছাড়াও যেকোনো বড় ধরনের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

২. সাইবার হামলায় বিদ্যুৎ, ব্যাংক ও যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে যাওয়া

ভবিষ্যতের যুদ্ধ শুধু অস্ত্র, গোলাবারুদ কিংবা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হবে, এমন ধারণা এখন আর যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার হামলাও একটি বড় নিরাপত্তাঝুঁকি হয়ে উঠেছে। কোনো দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্র, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বিমানবন্দর, বন্দর, হাসপাতাল কিংবা পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কম্পিউটার নেটওয়ার্কে বড় ধরনের সাইবার হামলা হলে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

ধরুন, একটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নষ্ট হয়ে গেল। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি পানির পাম্প, মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট এবং অনেক আর্থিক সেবা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। মানুষ হয়তো মোবাইল ব্যাংকিং থেকে টাকা তুলতে পারবে না, কার্ড দিয়ে কেনাকাটা করতে পারবে না, এমনকি প্রয়োজনীয় তথ্যও সংগ্রহ করতে পারবে না।

এমন পরিস্থিতিতে কয়েক দিনের খাবার ও বিশুদ্ধ পানি ঘরে থাকলে পরিবারকে সাময়িকভাবে নিরাপদ রাখা সহজ হয়। এই কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের জরুরি প্রস্তুতির পরিকল্পনায় সাইবার হামলাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। 

৩. ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ু পরিবর্তন

প্রাকৃতিক দুর্যোগ এমন একটি বিষয়, যা কোনো দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান দেখে আঘাত করে না। উন্নত দেশ হোক কিংবা উন্নয়নশীল দেশ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, দাবানল, তাপপ্রবাহ এবং অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগ যেকোনো জায়গায় ঘটতে পারে।

একটি ভয়াবহ বন্যার কথা চিন্তা করুন। রাস্তাঘাট পানিতে ডুবে গেছে, সেতু ভেঙে গেছে, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং আশপাশের বাজারগুলোতে পানি ঢুকে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাইরে থেকে খাবার নিয়ে আসা সম্ভব হবে না। আবার দীর্ঘদিনের খরা হলে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে। তীব্র তাপপ্রবাহে ফসল নষ্ট হতে পারে, পানির উৎস শুকিয়ে যেতে পারে এবং গবাদিপশুর খাদ্যসংকট তৈরি হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার ধরনেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে। এসব দুর্যোগ একসঙ্গে একাধিক অঞ্চলে দেখা দিলে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারেও চাপ তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশের অনেক মানুষ নদী, উপকূলীয় এলাকা এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ঘূর্ণিঝড় কিংবা বন্যার কারণে কোনো অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেখানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছানো কঠিন হতে পারে। তাই শুধু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নয়, স্থানীয় দুর্যোগের কথাও মাথায় রেখে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।

৪. মহামারি কিংবা নতুন কোনো সংক্রামক রোগের বিস্তার

কয়েক বছর আগের করোনা মহামারির কথা মনে করুন। পৃথিবীর মানুষ খুব অল্প সময়ের মধ্যে বুঝতে পেরেছিল, একটি অদৃশ্য ভাইরাস কীভাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারে। অনেক দেশে লকডাউন দেওয়া হয়েছিল, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সীমিত হয়েছিল, কারখানা বন্ধ হয়েছিল এবং বিভিন্ন পণ্যের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

করোনার সময় অনেক মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাবার, টয়লেট পেপার, মাস্ক ও অন্যান্য সামগ্রী কিনে ঘরে জমা করেছিলেন। ফলে কিছু জায়গায় অপ্রয়োজনীয় সংকটও তৈরি হয়েছিল। অথচ শুরু থেকেই যদি পরিবারগুলো সীমিত পরিমাণে প্রয়োজনীয় জিনিস সংরক্ষণ করত, তাহলে আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে যেত।

ভবিষ্যতে নতুন কোনো সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়লে একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অসুস্থতার কারণে কর্মীসংখ্যা কমে যেতে পারে, পরিবহন ও উৎপাদনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং কিছু এলাকায় চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আসতে পারে। তাই জরুরি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাবার ও প্রয়োজনীয় ওষুধ ঘরে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।

 উৎপাদন করি কিংবা পণ্য পরিবহন করি। এসব কাজের পেছনে জ্বালানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ডিজেল, পেট্রোল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং বিদ্যুতের সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, সেচ পাম্প, খাদ্য পরিবহনের ট্রাক, জাহাজ এবং শিল্পকারখানার বড় একটি অংশ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানির দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে কিংবা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে খাবারের উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই খাদ্য মজুদের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকেও বিভিন্ন দেশের জরুরি প্রস্তুতির আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

৬. বিশুদ্ধ পানির সংকট হতে পারে সবচেয়ে বড় বিপদ

আমরা খাবারের কথা বেশি চিন্তা করি, কিন্তু পানির গুরুত্ব অনেক সময় ভুলে যাই। অথচ মানুষ খাবার ছাড়া কিছুদিন বেঁচে থাকার চেষ্টা করতে পারলেও পানি ছাড়া দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। পানির সংকট তৈরি হলে শুধু পান করার সমস্যা হবে না; রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি এবং চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হবে।

বন্যার কারণে পানির উৎস দূষিত হতে পারে। ভূমিকম্পে পানির পাইপলাইন ভেঙে যেতে পারে। বিদ্যুৎ বন্ধ থাকলে গভীর নলকূপ কিংবা পানি সরবরাহের পাম্প কাজ নাও করতে পারে। আবার দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যেতে পারে।

জার্মানির নাগরিক সুরক্ষা সংস্থা BBK তাদের জরুরি প্রস্তুতির নির্দেশনায় খাবারের পাশাপাশি পানীয় জল সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তাদের নির্দেশনায় প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রতি সপ্তাহে প্রায় ১৪ লিটার তরল সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ একজন মানুষের জন্য সাত দিনে প্রায় ১৪ লিটার পানীয় ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তরল। 

এখান থেকে বোঝা যায়, জরুরি পরিস্থিতিতে শুধু খাবার মজুদ করলেই হবে না, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

৭. বিভিন্ন দেশ আসলে কত দিনের খাবার ও পানি মজুদ রাখতে বলছে?

এখানেই বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আগ্রহের। কারণ বিভিন্ন দেশের সরকারি নির্দেশনায় দেখা যাচ্ছে, জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকদের কয়েক দিন থেকে শুরু করে এক সপ্তাহ কিংবা তারও বেশি সময় নিজেদের প্রয়োজন নিজেরাই মেটানোর প্রস্তুতি রাখতে বলা হচ্ছে।

জার্মানি: জার্মানির Federal Office of Civil Protection and Disaster Assistance (BBK) নাগরিকদের এমনভাবে প্রস্তুত থাকতে বলেছে, যাতে তারা প্রায় ১০ দিন বাজারে না গিয়েও চলতে পারেন। এজন্য খাবার, পানীয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাদের নির্দেশনায় বিদ্যুৎ বিপর্যয়, বন্যা, তুষারঝড় এবং পরিবহনব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির কথা উল্লেখ রয়েছে। 

সুইডেন: সুইডেনের সরকারি জরুরি তথ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট Krisinformation নাগরিকদের অন্তত এক সপ্তাহ বিদ্যুৎ, পানি এবং দোকান থেকে খাবার কেনার সুযোগ ছাড়াই চলার প্রস্তুতি রাখতে বলছে। খাবার, পানীয়, প্রয়োজনীয় ওষুধ, আলো, তাপের ব্যবস্থা এবং যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

ফিনল্যান্ড: ফিনল্যান্ডে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিন নিজেদের প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী নিয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশটির সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে প্রত্যেক পরিবার যেন প্রাথমিকভাবে নিজেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টার জরুরি প্রস্তুতি রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেয়। খাদ্য, পানি, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরিচয়পত্র, টর্চ এবং যোগাযোগের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। 

এই দেশগুলোর নির্দেশনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার, সরকারগুলো মানুষকে আতঙ্কিত করতে চায় না। বরং বড় কোনো বিপর্যয় হলে যেন প্রত্যেক পরিবার প্রথম কয়েক দিন নিজেদের সামলে নিতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে চায়।

৮. সাধারণ মানুষ ঘরে কী কী জিনিস সংরক্ষণ করতে পারেন?

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের মতো সাধারণ মানুষ কীভাবে প্রস্তুতি নেব? এর জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করে বিশাল গুদাম তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মধ্য থেকেই অল্প অল্প করে কিছু অতিরিক্ত সামগ্রী সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

যেমন চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, চিড়া, মুড়ি, বিস্কুট, খেজুর, বাদাম, শুকনো খাবার, লবণ, চিনি, রান্নার তেল এবং দীর্ঘদিন ভালো থাকে এমন অন্যান্য খাবার রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি ক্যানজাত খাবার, দুধের গুঁড়া এবং সহজে প্রস্তুত করা যায় এমন খাবারও প্রয়োজন অনুযায়ী রাখা যায়। তবে পরিবারের সদস্যদের বয়স, স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস ও বিশেষ চাহিদা বিবেচনা করতে হবে।

পানির জন্য পরিষ্কার ও ঢাকনাযুক্ত পাত্র ব্যবহার করা উচিত। পানীয় জল নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং সংরক্ষণের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী পানির প্রয়োজন হিসাব করে রাখা ভালো।

এ ছাড়া বাড়িতে প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার বাক্স, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক, ম্যাচ, মোমবাতি, গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রের কপি এবং কিছু নগদ টাকা রাখা যেতে পারে। পরিবারের কোনো শিশু থাকলে তার খাবার, ডায়াপার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রীর কথাও মাথায় রাখতে হবে। বয়স্ক ব্যক্তি কিংবা নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন এমন কারও প্রয়োজনীয় ওষুধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকা উচিত।

৯. বাংলাদেশে আমাদের কেন আগে থেকেই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?

বাংলাদেশের বাস্তবতা একটু ভিন্ন। আমাদের দেশের অধিকাংশ পরিবার প্রতিদিনের আয় দিয়ে প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটায়। অনেক পরিবারের পক্ষে একসঙ্গে কয়েক দিনের খাবার কেনা সম্ভব হয় না। আবার শহরাঞ্চলের মানুষ বাজার, সুপারশপ, পানি সরবরাহ এবং বিদ্যুতের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল।

ঢাকা কিংবা বড় শহরগুলোতে যদি কয়েক দিন বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দ্রুত কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বহুতল ভবনে বসবাসকারী পরিবারগুলো পানির জন্য পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ না থাকলে পাম্প বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তখন শুধু খাবার নয়, গোসল করা, রান্না করা কিংবা দৈনন্দিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও কঠিন হয়ে যাবে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। উত্তরাঞ্চলে বন্যা কিংবা নদীভাঙন মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করতে পারে। কোনো এলাকায় রাস্তা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে সেখানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছাতে সময় লাগতে পারে।

তাই বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু জরুরি প্রস্তুতি রাখা। বিশেষ করে যেসব পরিবার বয়স্ক মানুষ, শিশু কিংবা অসুস্থ সদস্য নিয়ে বসবাস করে, তাদের একটু বেশি সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার। বিভিন্ন দেশের সরকার খাবার ও পানি সংরক্ষণের যে পরামর্শ দিচ্ছে, সেটিকে কেন্দ্র করে আতঙ্কিত হয়ে বাজার থেকে অতিরিক্ত পণ্য কিনে ফেলার কোনো প্রয়োজন নেই।

যদি সবাই একসঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি খাবার কিনতে শুরু করে, তাহলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। যাদের প্রতিদিনের খাবার কেনার সামর্থ্য সীমিত, তারাও বিপদে পড়তে পারেন। আবার অতিরিক্ত খাবার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাবে।

সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো, প্রতিদিনের বাজার করার সময় সামর্থ্য অনুযায়ী অল্প কিছু অতিরিক্ত পণ্য কেনা এবং পুরোনো পণ্য আগে ব্যবহার করা। খাবারের মেয়াদ পরীক্ষা করা, শুকনো ও পরিষ্কার জায়গায় সংরক্ষণ করা এবং নিয়মিত প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন পণ্য যুক্ত করা উচিত।

জরুরি প্রস্তুতির উদ্দেশ্য হলো বিপদের সময় নিজের পরিবারকে নিরাপদ রাখা, অন্য মানুষের জন্য সংকট তৈরি করা নয়। ফিনল্যান্ডের সরকারি নির্দেশনাতেও অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত পণ্য কিনে মজুদ করার পরিবর্তে পরিমিত প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। 

🌿 তাহলে ভবিষ্যতে আসলে কী হতে পারে?

সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ যখন তাদের নাগরিকদের খাবার, পানি, ওষুধ এবং জরুরি সামগ্রী সংরক্ষণের পরামর্শ দিচ্ছে, তখন কি ভবিষ্যতে সত্যিই কোনো বড় বিপদ আসতে যাচ্ছে?

এর সঠিক উত্তর কারও জানা নেই। হয়তো আগামী কয়েক বছরে বড় কোনো যুদ্ধ হবে না, হয়তো ভয়াবহ কোনো মহামারিও দেখা দেবে না। আবার কোনো একটি দেশে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাইবার হামলা কিংবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। এসব ঘটনার কোনোটি ঘটলেই যে পুরো পৃথিবীতে খাদ্যসংকট তৈরি হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।

কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত, পৃথিবীর আধুনিক জীবনব্যবস্থা অনেক বেশি পরস্পরনির্ভরশীল। আমরা মনে করি, টাকা থাকলে সবকিছু কিনতে পারব। অথচ সংকটের সময় টাকা থাকলেও পণ্য না পাওয়া সম্ভব। ব্যাংকে টাকা থাকলেও ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল থাকতে পারে। বাড়িতে ফ্রিজ থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকলে খাবার সংরক্ষণ করা কঠিন হতে পারে। আর বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয় জিনিসটিই নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।

তাই বিষয়টিকে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে একটি শিক্ষা হিসেবে নেওয়া উচিত। পরিবারকে নিয়ে বসে আলোচনা করুন, জরুরি পরিস্থিতিতে কে কী করবেন, প্রয়োজনীয় খাবার কোথায় রাখা হবে, পানির বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে এবং পরিবারের সদস্যরা কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন।

মনে রাখবেন, প্রস্তুতি নেওয়া মানেই বিপদ আসবে এমন নয়। বরং প্রস্তুতি না থাকলেই ছোট একটি সমস্যাও অনেক সময় বড় বিপদে পরিণত হয়।

শেষ কথা: পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকার যখন তাদের নাগরিকদের অন্তত তিন দিন, সাত দিন কিংবা দশ দিনের জরুরি প্রস্তুতি রাখার পরামর্শ দিচ্ছে, তখন আমাদেরও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। আজ হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক আছে, বাজারে খাবার পাওয়া যাচ্ছে, কল খুললেই পানি আসছে, বিদ্যুৎও আছে। কিন্তু এই স্বাভাবিকতা সব পরিস্থিতিতে একই রকম থাকবে, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।

একটু সচেতনতা, সামান্য প্রস্তুতি এবং পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস সংরক্ষণ করে রাখাই হতে পারে কঠিন সময়ে বড় একটি নিরাপত্তা।

আপনার কাছে একটি প্রশ্ন: যদি হঠাৎ কোনো কারণে টানা সাত দিন বাজার, বিদ্যুৎ ও পানির স্বাভাবিক সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে আপনার পরিবার কি সেই সাত দিন নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারবে? নাকি তখন থেকেই শুরু হবে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা?

ভাবার বিষয়টি কিন্তু আমাদের প্রত্যেকের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র হিসেবে জার্মানি, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি জরুরি প্রস্তুতি নির্দেশনা ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে উল্লেখিত প্রস্তুতির সময়সীমা দেশভেদে আলাদা এবং এগুলো কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম