মানুষের জীবনে এমন কিছু কাজ আছে, যেগুলো আমরা খুব সহজভাবে করে ফেলি, কিন্তু তার প্রভাব অন্য একজন মানুষের জীবনে কতটা গভীর হতে পারে—তা অনেক সময় ভেবে দেখি না। একটি কটু কথা, একটি অপমান, কারও দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি, কারও সম্মান নষ্ট করা, ইচ্ছা করে কাউকে অবহেলা করা কিংবা কোনো মানুষের হৃদয় ভেঙে দেওয়া—এসবকে আমরা অনেক সময় ‘ছোট ব্যাপার’ বলে মনে করি। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের অধিকার ও সম্মানের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি হয়তো কাউকে একটি কথা বলে ভুলে গেছেন। কিন্তু সেই কথাটি যার হৃদয়ে আঘাত করেছে, সে হয়তো রাতের পর রাত সেটি মনে করে কেঁদেছে। আপনি হয়তো মজা করে কারও গায়ে হাত দিয়েছেন, অপমান করেছেন কিংবা তার কোনো দুর্বলতা নিয়ে বন্ধুদের সামনে হাসাহাসি করেছেন। কিন্তু আপনার সেই কয়েক সেকেন্ডের আচরণ তার আত্মসম্মানে বছরের পর বছর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
ইসলাম তাই শুধু নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; ইসলাম মানুষকে মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ করতেও শেখায়। আল্লাহর বান্দাদের কষ্ট দেওয়া, তাদের অধিকার নষ্ট করা এবং জুলুম করা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।
মানুষের হৃদয় ভেঙে দেওয়া কেন এত ভয়ংকর?
মানুষের শরীরে আঘাত করলে ক্ষত দেখা যায়। চিকিৎসা করা যায়। কিন্তু হৃদয়ে আঘাত করলে সেই ক্ষত অনেক সময় চোখে দেখা যায় না। একজন মানুষ বাইরে থেকে স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়তে পারে।
কেউ হয়তো আপনার একটি কথায় নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। কেউ আপনার অপমানের কারণে মানুষের সামনে কথা বলতে ভয় পায়। কেউ আপনার প্রতারণার কারণে আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। আবার কেউ হয়তো আপনার আচরণের কারণে আল্লাহর কাছেই কাঁদতে বসেছে।
তাই মানুষের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে আমাদের খুব সতর্ক হওয়া দরকার।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচরণ এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন এবং অশ্লীলতা, অসৎকর্ম ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।”
—সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একজন মুসলিমের চরিত্র শুধু তার ইবাদতের মাধ্যমে প্রকাশ পায় না; বরং তার ব্যবহার, ন্যায়বোধ ও মানুষের সঙ্গে আচরণের মাধ্যমেও প্রকাশ পায়।
কাউকে কষ্ট দেওয়া শুধু ‘খারাপ ব্যবহার’ নয়
আমরা অনেক সময় বলি, ‘আমি তো শুধু মজা করেছি।’
কিন্তু যার সঙ্গে মজা করা হয়েছে, সে যদি অপমানিত হয়, তাহলে বিষয়টি আর নিছক মজা থাকে না। বিশেষ করে কারও চেহারা, শরীর, পরিবার, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, পেশা, পোশাক কিংবা ব্যক্তিগত কোনো দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“হে মুমিনগণ! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম।”
—সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১১
একটু চিন্তা করুন—যাকে আপনি তুচ্ছ মনে করছেন, আল্লাহর কাছে সে আপনার চেয়ে মর্যাদাবান হতে পারে।
আপনি কারও পোশাক নিয়ে হাসলেন।
কারও দারিদ্র্য নিয়ে ঠাট্টা করলেন।
কারও উচ্চারণ নিয়ে উপহাস করলেন।
কাউকে তার গায়ের রং নিয়ে অপমান করলেন।
মানুষ হয়তো হাসল, কিন্তু আল্লাহর কাছে বিষয়টি মোটেও হাসির নাও হতে পারে।
গীবতও মানুষকে কষ্ট দেওয়ার একটি ভয়ংকর মাধ্যম
মানুষকে কষ্ট দেওয়ার সবচেয়ে প্রচলিত মাধ্যমগুলোর একটি হলো গীবত। আমরা অনেক সময় এমনভাবে গীবত করি, যেন এটি কোনো বড় অপরাধই নয়।
অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ গীবতের সংজ্ঞা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দিয়েছেন।
সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, নবী ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো গীবত কী?’
সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন।
তিনি ﷺ বললেন, তোমার ভাই সম্পর্কে এমন কথা বলা যা সে অপছন্দ করে।
সাহাবিরা জানতে চাইলেন, আমি যা বলছি তা যদি সত্য হয়?
রাসুল ﷺ বললেন, তুমি যা বলছ তা সত্য হলে তুমি তার গীবত করেছ; আর সত্য না হলে তুমি তার ওপর অপবাদ দিয়েছ।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮৯
অর্থাৎ কেউ আপনার সামনে নেই বলে তার সম্পর্কে যা ইচ্ছা বলা যাবে—এমন নয়।
বরং তার অনুপস্থিতিতে এমন কথা বলা, যা সে শুনলে কষ্ট পেত, সেটিও গুরুতর অন্যায় হতে পারে।
জিহ্বার একটি কথাই মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে
জিহ্বা ছোট একটি অঙ্গ। কিন্তু এর মাধ্যমে মানুষ যেমন অসংখ্য নেকি অর্জন করতে পারে, তেমনি অসংখ্য গুনাহও করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪৭
এই একটি শিক্ষা যদি আমরা জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমাদের অনেক সম্পর্কের সমস্যা দূর হয়ে যাবে।
কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন:
- কথাটি কি সত্য?
- কথাটি কি প্রয়োজনীয়?
- কথাটি কি কাউকে অকারণে কষ্ট দেবে?
- কথাটি কি আল্লাহ পছন্দ করবেন?
- আমি নিজে এই কথাটি শুনলে কেমন অনুভব করতাম?
এই পাঁচটি প্রশ্ন অনেক অনর্থক কথা থেকে আমাদের বাঁচাতে পারে।
মুমিনের পরিচয় অন্য মানুষ তার হাত ও জিহ্বা থেকে নিরাপদ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“মুসলিম সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে মুসলিমরা নিরাপদ।”
—সহিহ বুখারি, হাদিস ১০; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০
খেয়াল করুন, এখানে শুধু নামাজ পড়া বা রোজা রাখার কথা বলা হয়নি। বরং একজন মুসলিমের পরিচয়ের সঙ্গে অন্য মানুষ তার হাত ও জিহ্বা থেকে নিরাপদ থাকার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।
অর্থাৎ আপনি নামাজ পড়ছেন, রোজা রাখছেন, কুরআন পড়ছেন—কিন্তু আপনার মুখের কথায় মানুষ প্রতিদিন কাঁদছে, আপনি মানুষকে অপমান করছেন, অধিকার নষ্ট করছেন, অন্যায় করছেন—তাহলে নিজের চরিত্র নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়: মানুষের হক
আল্লাহর হক এবং বান্দার হক—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বান্দার হকের ব্যাপারে বিষয়টি আরও সতর্কতার দাবি রাখে। কারণ আপনি কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দিলে শুধু আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেই বিষয়টি সবসময় শেষ হয়ে যায় না; যার অধিকার নষ্ট করেছেন, তার হকও আদায় করতে হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ ‘মুফলিস’ বা নিঃস্ব ব্যক্তির ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি হাদিস বলেছেন।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, নবী ﷺ সাহাবিদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি জানো নিঃস্ব কে?’
সাহাবিরা বললেন, আমাদের মধ্যে যার কোনো দিরহাম বা সম্পদ নেই, সে নিঃস্ব।
তখন রাসুল ﷺ ব্যাখ্যা করলেন, তাঁর উম্মতের প্রকৃত নিঃস্ব ব্যক্তি হলো সেই ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন নামাজ, রোজা ও জাকাত নিয়ে আসবে; কিন্তু সে কাউকে গালি দিয়েছে, কাউকে অপবাদ দিয়েছে, কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে খেয়েছে, কারও ওপর জুলুম করেছে বা কাউকে আঘাত করেছে। তখন তার নেক আমলগুলো ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে দিয়ে দেওয়া হবে। নেকি শেষ হয়ে গেলে তাদের গুনাহ তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৮১
এই হাদিসটি আমাদের জন্য ভীষণ সতর্কবার্তা।
ভাবুন, একজন মানুষ সারাজীবন নামাজ পড়েছে, রোজা রেখেছে, দান করেছে। কিন্তু মানুষের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছে। কিয়ামতের দিন তার নিজের নেক আমল অন্যদের দিয়ে দিতে হতে পারে।
তাহলে আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—আমি কি শুধু নিজের আমল বাড়াচ্ছি, নাকি মানুষের অধিকারও রক্ষা করছি?
কারও চোখের পানি আপনার জন্য বিপদের কারণ হতে পারে
কোনো মানুষের কান্নাকে কখনো তুচ্ছ মনে করবেন না। বিশেষ করে যদি সে আপনার অন্যায়ের কারণে কাঁদে।
ইসলামে মজলুমের দোয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা এসেছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ মু‘আয ইবনু জাবাল (রা.)-কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় উপদেশ দিয়েছিলেন—
“মজলুমের দোয়া থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মধ্যে কোনো পর্দা নেই।”
—সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪৯৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৯
এর অর্থ এই নয় যে, কেউ কষ্ট পেলেই তার প্রতিটি কথা নিশ্চিতভাবে বাস্তবায়িত হবে। বরং হাদিসটি জুলুম ও অন্যায়ের ভয়াবহতা বোঝায়।
তাই কাউকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেওয়ার আগে ভাবুন—আপনি যার ওপর জুলুম করছেন, তার অভিযোগ সরাসরি আল্লাহর কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
ক্ষমা চাওয়া কেন জরুরি?
কাউকে কষ্ট দেওয়ার পর অনেকেই মনে করেন, ‘আল্লাহর কাছে তওবা করেছি, বিষয় শেষ।’
কিন্তু যদি আপনার কারণে কোনো মানুষের অধিকার নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি যথাসম্ভব সংশোধন করাও জরুরি।
আপনি যদি কারও টাকা অন্যায়ভাবে নিয়ে থাকেন, টাকা ফেরত দিন।
কারও সম্মান নষ্ট করে থাকেন, নিজের ভুল সংশোধনের চেষ্টা করুন।
কারও সঙ্গে অন্যায় করে থাকেন, তার কাছে ক্ষমা চান—যদি ক্ষমা চাওয়াই পরিস্থিতি ঠিক করার উপযুক্ত উপায় হয়।
কারও সম্পর্কে মিথ্যা কথা ছড়িয়ে থাকলে, সেটি সংশোধন করার চেষ্টা করুন।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—ক্ষমা চাওয়ার পদ্ধতিও বিচক্ষণতার সঙ্গে হওয়া উচিত। এমনভাবে নিজের অপরাধ প্রকাশ করা উচিত নয়, যার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নতুন করে ক্ষতি হয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী আলেম বা বিশ্বস্ত জ্ঞানী ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ক্ষমা করা মহৎ, কিন্তু জুলুম করা কখনোই বৈধ নয়
ইসলাম মানুষকে ক্ষমা করতে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু ক্ষমা করার শিক্ষা মানে এই নয় যে অন্যায়কারীকে অন্যায় করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আল্লাহ বলেন—
“যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে; আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪
ক্ষমা করা মহৎ চরিত্র। কিন্তু অন্যের ওপর জুলুম করা কোনোভাবেই বৈধ হয়ে যায় না।
একজন মানুষ আপনাকে ক্ষমা করে দিলেই আপনি ভবিষ্যতে আবার একই কাজ করতে পারেন—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।
বরং কেউ ক্ষমা করে দিলে আপনার উচিত আরও বেশি লজ্জিত হওয়া এবং নিজের চরিত্র সংশোধন করা।
পরিবারেও মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বাঁচতে হবে
আমরা অনেক সময় বাইরের মানুষের সঙ্গে খুব ভদ্র আচরণ করি, কিন্তু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কঠিন ভাষায় কথা বলি।
স্ত্রীকে অপমান করা, স্বামীকে ছোট করা, সন্তানের সামনে তাকে তুচ্ছ করা, বাবা-মায়ের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করা, ভাই-বোনের অধিকার নষ্ট করা—এসবও মানুষের কষ্টের অন্তর্ভুক্ত।
বিশেষ করে সন্তানদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে বাবা-মাকে সতর্ক হওয়া উচিত।
‘তুই কিছুই পারবি না’, ‘তুই অকর্মণ্য’, ‘তোর কোনো ভবিষ্যৎ নেই’—এ ধরনের কথাগুলো একটি শিশুর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
শিশুকে শাসন করা আর শিশুর আত্মসম্মান ধ্বংস করে দেওয়া এক বিষয় নয়।
একইভাবে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও কথার ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংসারে মতবিরোধ হবেই। কিন্তু মতবিরোধের সময় এমন কথা বলা উচিত নয়, যা সম্পর্কের ভিত্তিই নষ্ট করে দেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে কষ্ট দেওয়া
বর্তমান যুগে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার একটি নতুন মাধ্যম হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
একটি পোস্ট, একটি কমেন্ট, একটি ছবি, একটি মিম বা একটি স্ক্রিনশট মুহূর্তের মধ্যে হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
আপনি হয়তো মজা করে কারও ছবি শেয়ার করলেন। কিন্তু সেই মানুষটি হয়তো সামাজিকভাবে অপমানিত হলো।
আপনি কারও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে পোস্ট করলেন।
কারও ভুলকে ভাইরাল করে দিলেন।
কারও দুর্বলতা নিয়ে হাসাহাসি করলেন।
কোনো যাচাই ছাড়াই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে দিলেন।
এসবের পরিণতি খুবই মারাত্মক হতে পারে।
তাই অনলাইনে পোস্ট বা মন্তব্য করার আগে একটু থামুন।
পোস্ট করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন:
- এটি কি সত্য?
- এটি কি ন্যায়সঙ্গত?
- এতে কি কারও সম্মান নষ্ট হবে?
- এটি কি আমার নিজের জন্যও লজ্জার কারণ হতে পারে?
- কিয়ামতের দিন এই কথার জবাব দিতে হলে আমি কি প্রস্তুত?
একটি ‘সেন্ড’ বাটনে চাপ দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করা কখনো কখনো বড় গুনাহ থেকে বাঁচাতে পারে।
অহংকার থেকেও মানুষকে কষ্ট দেওয়া হয়
অনেক সময় আমরা নিজেদের অবস্থান, টাকা, শিক্ষা, সৌন্দর্য, ক্ষমতা বা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে অহংকার করি।
এরপর দুর্বল মানুষকে তুচ্ছ করি।
আল্লাহ তাআলা অহংকার পছন্দ করেন না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেউ যদি সুন্দর পোশাক ও জুতা পছন্দ করে?
নবী ﷺ ব্যাখ্যা করেন, আল্লাহ সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্য পছন্দ করেন। অহংকার হলো সত্যকে প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছ করা।
অর্থাৎ সুন্দর পোশাক পরা অহংকার নয়; বরং অন্য মানুষকে ছোট মনে করাই অহংকারের একটি বড় প্রকাশ।
কাউকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য কীভাবে নিজেকে বদলাবেন?
মানুষের সঙ্গে সুন্দর আচরণ একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে সংশোধন করতে হয়।
প্রথমে নিজের জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণ করুন। রাগের সময় চুপ থাকার অভ্যাস করুন।
দ্বিতীয়ত, কারও দুর্বলতা নিয়ে হাসবেন না। আপনি জানেন না, সে মানুষটি ভেতরে কী যুদ্ধ করছে।
তৃতীয়ত, কারও ভুল দেখলে তাকে সবার সামনে অপমান না করে একান্তে বুঝিয়ে বলুন।
চতুর্থত, নিজের ভুল হলে দ্রুত ‘আমি দুঃখিত’ বলতে শিখুন।
পঞ্চমত, কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে বিষয়টি এড়িয়ে যাবেন না। পরিস্থিতি বুঝে ক্ষমা চান এবং ক্ষতি পূরণের চেষ্টা করুন।
ষষ্ঠত, গীবতের আসর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিন।
সপ্তমত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সম্মান নিয়ে কথা বলার আগে বহুবার চিন্তা করুন।
অষ্টমত, মনে রাখুন—আপনার সঙ্গে মানুষ যেমন আচরণ করুক, আপনি কেমন মানুষ হবেন সেটি আপনার নিজের সিদ্ধান্ত।
মানুষকে ভালোবাসা ইসলামের সৌন্দর্য
ইসলাম শুধু নিষেধের ধর্ম নয়; ইসলাম মানুষের প্রতি দয়া, ভালোবাসা ও সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন না।”
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৬০১৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩১৯
তাই একজন মুসলিমের হৃদয়ে মানুষের জন্য মমতা থাকা উচিত।
কেউ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ানো, কেউ কাঁদলে সান্ত্বনা দেওয়া, কেউ ভুল করলে সুন্দরভাবে বোঝানো, কেউ অসহায় হলে সাহায্য করা—এসবই ইসলামের সৌন্দর্য।
আপনি জানেন না, আপনার একটি ভালো কথা কারও জীবন বদলে দিতে পারে।
আপনার একটি সহানুভূতিশীল আচরণ হয়তো একজন হতাশ মানুষকে আবার আশাবাদী করে তুলতে পারে।
আপনার একটি ক্ষমা হয়তো একটি সম্পর্ক বাঁচিয়ে দিতে পারে।
আজ থেকেই একটি সিদ্ধান্ত নিন
আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এমন মানুষ আছে, যাদের আমরা কখনো না কখনো কষ্ট দিয়েছি।
হয়তো বাবা-মা।
হয়তো ভাই-বোন।
হয়তো বন্ধু।
হয়তো জীবনসঙ্গী।
হয়তো কোনো সহকর্মী।
হয়তো এমন কেউ, যার নাম আজও মনে পড়ে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো—ভুল হয়ে গেলে ফিরে আসা।
আজই নিজেকে প্রশ্ন করুন:
আমি কি কারও হৃদয় ভেঙেছি?
যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে অহংকার করে বসে থাকবেন না।
সম্ভব হলে তার কাছে ক্ষমা চান। অন্যায়ের ক্ষতিপূরণ করুন। নিজের আচরণ পরিবর্তন করুন। আর আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে তওবা করুন।
কারণ মানুষের জীবন খুব ছোট। আমরা জানি না, আগামীকাল কারও সঙ্গে দেখা হবে কি না।
কখনো কখনো আমরা ভাবি, ‘পরে ক্ষমা চেয়ে নেব।’
কিন্তু সেই ‘পরে’ হয়তো আর আসে না।
শেষ কথা
মানুষকে কষ্ট দেওয়া খুব সহজ। একটি কঠিন কথা বলতে এক সেকেন্ড লাগে। কাউকে অপমান করতে কয়েক মুহূর্ত লাগে। একটি গুজব ছড়াতে কয়েকটি আঙুলের স্পর্শই যথেষ্ট।
কিন্তু সেই কষ্ট মুছে দিতে অনেক বছর লেগে যেতে পারে।
তাই কথা বলার আগে ভাবুন। রাগ করার আগে ভাবুন। কারও সম্পর্কে কিছু বলার আগে ভাবুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু পোস্ট করার আগে ভাবুন।
মনে রাখবেন, আপনি যার সঙ্গে কথা বলছেন, সে-ও একজন মানুষ। তারও অনুভূতি আছে, আত্মসম্মান আছে, কষ্ট আছে, স্বপ্ন আছে।
আর সর্বোপরি—সে আল্লাহর সৃষ্টি।
আজ আপনি শক্তিশালী বলে কাউকে দুর্বল ভেবে কষ্ট দিতে পারেন। কিন্তু পৃথিবীর ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ আপনি যার ওপর প্রভাব খাটাচ্ছেন, কাল হয়তো আপনাকেই তার সামনে দাঁড়াতে হতে পারে। আর দুনিয়ার আদালতে কোনো জবাবদিহি না হলেও আখিরাতের আদালত থেকে কেউ পালাতে পারবে না।
তাই আসুন, আমরা এমন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করি, যার হাত ও জিহ্বা থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে। এমন মানুষ হই, যার কারণে কেউ কাঁদে না; বরং যার কারণে কারও মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
কারও হৃদয় ভেঙে দেওয়ার চেয়ে একটি হৃদয় জয় করা অনেক বড় অর্জন।
কারও দুর্বলতার সুযোগ নেওয়ার চেয়ে তার পাশে দাঁড়ানো অনেক সুন্দর।
কারও ভুল নিয়ে হাসার চেয়ে তাকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করা অনেক মহৎ।
এবং মানুষের মনে কষ্টের দাগ রেখে যাওয়ার চেয়ে ভালোবাসা, দয়া ও সুন্দর আচরণের স্মৃতি রেখে যাওয়াই একজন মুমিনের জন্য উত্তম পথ।
আল্লাহ আমাদের জিহ্বা, হাত ও আচরণকে এমন করে দিন, যাতে আমাদের কারণে কোনো মানুষ অকারণে কষ্ট না পায়। আর আমরা যাদের কষ্ট দিয়েছি, তাদের হক আদায় করার এবং আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
