শিশু নিখোঁজ হলে সবার আগে যা করবেন!

একটি শিশু হঠাৎ চোখের সামনে থেকে হারিয়ে গেলে সেই মুহূর্তটা কোনো বাবা-মায়ের জন্য কেমন হতে পারে, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। কয়েক মিনিট আগেও যে শিশুটি পাশে ছিল, খেলছিল, কথা বলছিল কিংবা স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার কথা ছিল—হঠাৎ তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তখন স্বাভাবিকভাবেই মাথা কাজ করতে চায় না। কান্না, ভয়, দুশ্চিন্তা আর নানা ধরনের আশঙ্কা একসঙ্গে ঘিরে ধরে।

কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আতঙ্কিত হয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত এবং পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া। শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েকটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জানা উচিত, এমন ঘটনা ঘটলে প্রথমে কী করতে হবে, কাকে জানাতে হবে এবং কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলতে হবে।

এই লেখায় ধাপে ধাপে সেই বিষয়গুলোই সহজ ভাষায় তুলে ধরা হলো।

১. প্রথমেই নিশ্চিত হন—শিশু সত্যিই নিখোঁজ কি না

শিশুকে তার স্বাভাবিক জায়গায় না পাওয়া গেলে প্রথমেই দ্রুত আশপাশে খোঁজ করুন। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—শিশুকে খুঁজতে গিয়ে দীর্ঘ সময় একা একা ঘুরে সময় নষ্ট করবেন না।

শিশু সাধারণত কোথায় খেলতে যায়, কোন প্রতিবেশীর বাসায় যায়, বাড়ির ছাদে যায় কি না, পাশের দোকান বা মাঠে যায় কি না—এসব জায়গা দ্রুত পরীক্ষা করুন।

একই সঙ্গে পরিবারের অন্য একজনকে দিয়ে শিশুর বন্ধু, আত্মীয়, প্রতিবেশী বা পরিচিতদের ফোন করান।

যেমন—

  • শিশুর ঘর ও বাড়ির সব কক্ষ দেখুন।
  • ছাদ, সিঁড়ি, গ্যারেজ ও উঠান পরীক্ষা করুন।
  • বাড়ির আশপাশের গলি, মাঠ, দোকান ও পরিচিত জায়গাগুলো দেখুন।
  • শিশুর বন্ধুদের বাসায় যোগাযোগ করুন।
  • স্কুল বা কোচিংয়ে যাওয়ার কথা থাকলে সেখানে যোগাযোগ করুন।
  • পরিবারের অন্য সদস্যদের জিজ্ঞেস করুন, শেষবার কে শিশুটিকে দেখেছেন।

তবে এসব করতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেরি করবেন না।

২. যত দ্রুত সম্ভব পুলিশকে জানান

শিশু নিখোঁজ হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো দ্রুত পুলিশকে অবহিত করা

বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যায়। বাংলাদেশ পুলিশের হটলাইন তালিকাতেও ৯৯৯-কে জরুরি সেবা এবং ১০৯৮-কে শিশু সহায়তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাই শিশুকে খুঁজে না পেলে “আরও কিছুক্ষণ দেখি, হয়তো নিজেই ফিরে আসবে”—এমন চিন্তা করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা উচিত নয়।

বিশেষ করে যদি—

  • শিশু খুব ছোট হয়,
  • শিশুকে কেউ নিয়ে গেছে বলে সন্দেহ হয়,
  • অপহরণের আশঙ্কা থাকে,
  • শিশুর ফোন বন্ধ থাকে,
  • কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শিশুকে শেষবার দেখা যায়,
  • শিশু কোনো নির্দিষ্ট জায়গা থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়,

তাহলে দ্রুত পুলিশকে জানান।

বাংলাদেশ পুলিশও বিভিন্ন জরুরি ঘটনায় দ্রুততম সময়ে পুলিশকে জানানোর জন্য জনগণকে আহ্বান করেছে।

৩. শিশুর সাম্প্রতিক ছবি প্রস্তুত রাখুন

পুলিশ বা উদ্ধারকারী দলের কাছে শিশুর সাম্প্রতিক এবং পরিষ্কার ছবি দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

অনেক সময় বাবা-মা পুরোনো ছবি দেন। কিন্তু শিশুর চেহারা, চুলের ধরন বা পোশাক পরিবর্তিত হয়ে থাকতে পারে। তাই সম্ভব হলে এমন ছবি দিন, যেটি সাম্প্রতিক সময়ে তোলা হয়েছে।

ছবির পাশাপাশি শিশুর সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখে রাখুন।

যেমন—

  • শিশুর পূর্ণ নাম
  • বয়স
  • উচ্চতা
  • গায়ের রং
  • চুলের ধরন
  • শেষবার পরা পোশাক
  • জুতা বা স্যান্ডেলের ধরন
  • কোনো বিশেষ জন্মদাগ বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য
  • শেষবার কোথায় দেখা গেছে
  • শিশুর সঙ্গে মোবাইল ফোন ছিল কি না
  • শিশুর পরিচিত বন্ধু বা আত্মীয়দের তথ্য

এসব তথ্য যত পরিষ্কারভাবে দেওয়া যাবে, খোঁজার কাজ তত সহজ হতে পারে।

৪. শেষবার কোথায় এবং কখন দেখা গেছে—সেটি লিখে রাখুন

আতঙ্কের সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই কাগজে বা মোবাইলের নোটে লিখে রাখুন—

“শিশুটিকে শেষবার কখন, কোথায় এবং কার সঙ্গে দেখা গেছে?”

ধরুন, দুপুর ৩টায় শিশুকে বাসার সামনে খেলতে দেখা গেছে। ৩টা ২০ মিনিটে তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাহলে এই সময়ের ব্যবধানটিও গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবারের প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করুন—

“শেষবার তুমি তাকে কখন দেখেছ?”

“সে তখন কী করছিল?”

“কার সঙ্গে ছিল?”

“কোন দিকে গিয়েছিল?”

এভাবে তথ্য সংগ্রহ করলে ঘটনাটির একটি পরিষ্কার টাইমলাইন তৈরি হবে।

৫. আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার কথা মাথায় রাখুন

বর্তমানে অনেক বাসা, দোকান, মার্কেট, স্কুল, মসজিদ, রাস্তার প্রবেশপথ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকে।

শিশু নিখোঁজ হওয়ার জায়গার আশপাশে যদি কোনো ক্যামেরা থাকে, তাহলে দ্রুত সেই ফুটেজ সংরক্ষণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন এবং পুলিশকে বিষয়টি জানান।

তবে নিজে গিয়ে কারও সঙ্গে ঝগড়া বা জোর করে ক্যামেরার ফুটেজ নেওয়ার চেষ্টা না করে বিষয়টি পুলিশকে জানানো নিরাপদ।

কারণ ফুটেজের একটি নির্দিষ্ট সময়ের অংশ পরবর্তীতে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

৬. শিশুর মোবাইল ফোন থাকলে তথ্য সংরক্ষণ করুন

যদি শিশুর কাছে মোবাইল ফোন থাকে, তাহলে ফোনে বারবার কল করার পাশাপাশি শিশুর শেষ যোগাযোগের তথ্য পুলিশকে জানান।

শিশু কার সঙ্গে কথা বলেছে, কার কাছ থেকে ফোন পেয়েছে বা সম্প্রতি কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেছে কি না—এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

তবে নিজেরা কোনো ব্যক্তিকে সন্দেহ করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়ানো ঠিক নয়। কারণ ভুল তথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

প্রযুক্তিগতভাবে ফোন ট্র্যাকিং বা লোকেশন বের করার চেষ্টা পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করাই উচিত।

৭. শিশুর বন্ধু ও পরিচিতদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করুন

শিশুর সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের অনেক সময় বাবা-মায়ের চেয়েও বেশি তথ্য জানা থাকতে পারে।

শিশু কোথায় যেতে চেয়েছিল, কার সঙ্গে দেখা করার কথা বলেছিল, কোনো নতুন বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করছিল কি না—এসব বিষয় বন্ধুদের কাছ থেকে জানা যেতে পারে।

তবে শিশুদের জিজ্ঞাসাবাদের সময় ভয় দেখাবেন না।

শান্তভাবে জিজ্ঞেস করুন—

  • “ও কি কোথাও যাওয়ার কথা বলেছিল?”
  • “কোনো জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল?”
  • “কাউকে নিয়ে কিছু বলেছিল?”
  • “সাম্প্রতিক সময়ে কারও সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়েছিল?”

একটি ছোট তথ্যও কখনো কখনো অনুসন্ধানে সহায়ক হতে পারে।

৮. ১০৯৮ শিশু সহায়তা লাইনে যোগাযোগ করুন

বাংলাদেশে শিশুদের জন্য সরকারি চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮ রয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী এটি শিশুদের সহায়তার জন্য দেশব্যাপী চালু থাকা একটি টোল-ফ্রি সেবা এবং ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম পরিচালনা করে। শিশু নিজে অথবা শিশুর বিষয়ে উদ্বিগ্ন অন্য কোনো ব্যক্তিও এখানে যোগাযোগ করতে পারেন।

শিশু নিখোঁজ, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা, নির্যাতন, পাচার বা শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ থাকলে ১০৯৮-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রয়োজন অনুযায়ী হেল্পলাইন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, পুলিশ, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন বা প্রবেশন কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারে।

তাই মনে রাখুন—

জরুরি পরিস্থিতি → ৯৯৯

শিশু-সংক্রান্ত সহায়তা → ১০৯৮

৯. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করলে সতর্ক থাকুন

শিশু নিখোঁজ হলে অনেক পরিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি ও তথ্য দিয়ে পোস্ট করেন। সঠিকভাবে করলে এটি মানুষের কাছে তথ্য পৌঁছাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু পোস্ট করার সময় কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার।

প্রথমত, শিশুর পুরো ঠিকানা, অভিভাবকের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর বা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করবেন না যা শিশুর নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

পোস্টে সাধারণত প্রয়োজনীয় তথ্য রাখুন—

  • শিশুর সাম্প্রতিক ছবি
  • নাম
  • বয়স
  • নিখোঁজ হওয়ার তারিখ ও সময়
  • শেষ দেখা স্থান
  • পরনের পোশাক
  • যোগাযোগের জন্য নির্ভরযোগ্য নম্বর
  • সংশ্লিষ্ট থানার তথ্য বা পুলিশের নির্দেশনা

পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তথ্য প্রকাশ করাই নিরাপদ পদ্ধতি।

১০. যাচাই না করে কোনো তথ্য ছড়াবেন না

শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার ভীষণ মানসিক চাপে থাকে। তখন কেউ ফোন করে বলতে পারে, “আমি শিশুটিকে অমুক জায়গায় দেখেছি।”

এমন খবর পেলে উত্তেজিত হয়ে একা সেখানে ছুটে যাবেন না।

প্রথমে তথ্যটি পুলিশকে জানান এবং সম্ভব হলে তথ্যদাতার পরিচয় ও অবস্থান নোট করে রাখুন।

কারণ নিখোঁজ শিশুকে কেন্দ্র করে প্রতারণার ঘটনাও ঘটতে পারে। কেউ পরিবারের ভয় ও অসহায়তার সুযোগ নিয়ে টাকা দাবি করতে পারে।

কেউ যদি বলে—

“টাকা দিলে শিশুর খবর দেব”

তাহলে নিজের সিদ্ধান্তে টাকা পাঠানো বা একা দেখা করতে যাওয়া ঠিক নয়। বিষয়টি দ্রুত পুলিশকে জানান।

১১. সম্ভাব্য অপহরণের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্ক থাকুন

যদি মনে হয় শিশুকে কেউ জোর করে নিয়ে গেছে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি হিসেবে বিবেচনা করুন।

বিশেষ করে যদি মুক্তিপণ দাবি করা হয়, তাহলে ফোনকারীকে নিয়ে নিজে তদন্ত করতে যাবেন না।

যা করবেন—

  • ফোন নম্বর সংরক্ষণ করুন।
  • কলের সময় লিখে রাখুন।
  • সম্ভব হলে কথোপকথনের তথ্য সংরক্ষণ করুন।
  • কোনো মেসেজ বা ভয়েস মেসেজ মুছে ফেলবেন না।
  • টাকা পাঠানোর আগে অবশ্যই পুলিশকে জানান।
  • কোথায় যেতে বলা হয়েছে, তা পুলিশকে জানান।
  • সন্দেহভাজন ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যাবেন না।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবারের নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ।

১২. শিশুর স্কুল, কোচিং ও যাতায়াতের পথ পরীক্ষা করুন

শিশু স্কুলে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হলে শুধু স্কুলে খোঁজ করলেই হবে না। বাসা থেকে স্কুল পর্যন্ত শিশুর নিয়মিত যাতায়াতের পথও খুঁজে দেখতে হবে।

যেসব জায়গায় শিশুটি নিয়মিত যেত, সেগুলোর তালিকা করুন।

যেমন—

  • স্কুল
  • কোচিং
  • খেলার মাঠ
  • বন্ধুর বাসা
  • আত্মীয়ের বাসা
  • লাইব্রেরি
  • দোকান
  • মসজিদ বা ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র
  • পার্ক

তবে একসঙ্গে অনেক মানুষকে এলোমেলোভাবে পাঠানোর বদলে একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি পুরো অনুসন্ধানের সমন্বয় করলে তথ্যের পুনরাবৃত্তি কমে।

১৩. শিশুর ঘর ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র খেয়াল করুন

শিশু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে কোথাও চলে গিয়ে থাকে, তাহলে কিছু ইঙ্গিত রেখে যেতে পারে।

তাই শান্তভাবে লক্ষ্য করুন—

  • কোনো ব্যাগ সঙ্গে নিয়েছে কি না
  • অতিরিক্ত পোশাক নিয়েছে কি না
  • ডায়েরি বা নোটে কিছু লিখেছে কি না
  • কোনো চিঠি বা কাগজ আছে কি না
  • মোবাইল বা চার্জার সঙ্গে আছে কি না
  • কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য আছে কি না

তবে কোনো জিনিস নষ্ট বা পরিবর্তন করবেন না। সন্দেহজনক কিছু থাকলে পুলিশকে জানান।

১৪. নিজেরা মারামারি বা সন্দেহভাজনকে আটকানোর চেষ্টা করবেন না

শিশুর প্রতি ভালোবাসা এবং ভয়—দুটিই এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তুলতে পারে। কিন্তু কাউকে সন্দেহ হলেই তাকে মারধর করা, আটকে রাখা বা জনতার হাতে তুলে দেওয়া বিপজ্জনক এবং আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সন্দেহের তথ্য পুলিশকে দিন।

কারণ আসল লক্ষ্য হলো শিশুকে নিরাপদে উদ্ধার করা। উত্তেজনা বাড়িয়ে পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ করা নয়।

১৫. পরিবারের মধ্যে একজনকে তথ্য সমন্বয়ের দায়িত্ব দিন

নিখোঁজ শিশুকে খুঁজতে গিয়ে অনেক মানুষ বিভিন্ন জায়গায় ফোন করেন। এতে কখনো কখনো একই তথ্য বারবার দেওয়া হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হারিয়ে যেতে পারে।

তাই একজনকে দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে—

“কে কোথায় খুঁজছে, কার সঙ্গে কথা হয়েছে, কী তথ্য পাওয়া গেছে”—এসব লিখে রাখার জন্য।

একটি সাধারণ তালিকা তৈরি করুন—

বিষয় তথ্য
শিশুর নাম
বয়স
শেষ দেখা সময়
শেষ দেখা স্থান
পরনের পোশাক
সঙ্গে কী ছিল
কার সঙ্গে ছিল
পুলিশকে জানানো হয়েছে কি না
৯৯৯-এ যোগাযোগ
১০৯৮-এ যোগাযোগ
সম্ভাব্য স্থান

এভাবে তথ্য সাজিয়ে রাখলে পুলিশ বা উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সহজ হবে।

১৬. শিশুকে পাওয়া গেলে প্রথমেই তাকে নিরাপদ করুন

অনেক সময় দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর শিশুকে পাওয়া যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই পরিবারের সবাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন।

কিন্তু শিশুকে ফিরে পাওয়ার পর প্রথম কাজ হওয়া উচিত তাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসা এবং তার শারীরিক অবস্থা দেখা।

শিশুটি ভয় পেয়েছে কি না, আহত হয়েছে কি না, অসুস্থ কি না—এসব খেয়াল করুন।

তারপর শান্তভাবে কথা বলুন।

“কোথায় ছিলে?”—এর আগে জিজ্ঞেস করতে পারেন, “তুমি ঠিক আছ তো?”

শিশুকে বকাঝকা বা মারধর করা উচিত নয়। কারণ সে ভয় পেলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করতে পারে।

১৭. শিশুকে পাওয়া গেলেও পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন

শিশু ফিরে এসেছে মানেই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেছে—এমন নয়।

বিশেষ করে যদি শিশুকে কেউ নিয়ে গিয়ে থাকে, ভয় দেখানো হয়ে থাকে, নির্যাতনের আশঙ্কা থাকে বা শিশুর বক্তব্যে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় পাওয়া যায়, তাহলে পুলিশ ও প্রয়োজনীয় শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান।

শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১৮. একটি বিষয় মনে রাখবেন—দোষারোপ নয়, দ্রুত পদক্ষেপ

শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের মধ্যে একে অপরকে দোষারোপ শুরু হয়ে যেতে পারে।

“তুমি কেন দেখনি?”

“তুমি কোথায় ছিলে?”

“তুমি খেয়াল রাখোনি কেন?”

এসব প্রশ্ন পরে আলোচনা করা যাবে। কিন্তু প্রথম মুহূর্তে এসব নিয়ে সময় নষ্ট না করে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

কারণ সেই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—

“শিশুটিকে কীভাবে দ্রুত এবং নিরাপদে খুঁজে পাওয়া যায়?”

জরুরি নম্বরগুলো মনে রাখুন

বাংলাদেশ পুলিশের সরকারি হটলাইন তালিকা অনুযায়ী—

  • ৯৯৯ — জাতীয় জরুরি সেবা
  • ১০৯৮ — শিশু সহায়তা
  • ১০৯/১০৯২১ — নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত সহায়তা

সরকারি জাতীয় তথ্য বাতায়নেও ১০৯৮-কে শিশু সহায়তা লাইন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে জরুরি নম্বর বা সেবার পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট সরকারি ওয়েবসাইট থেকেও তথ্য যাচাই করা ভালো।

শেষ কথা

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়া শুধু একটি পরিবারের সমস্যা নয়—এটি পুরো সমাজের জন্য একটি গুরুতর বিষয়। কোনো শিশুকে একা, অসহায় বা সন্দেহজনক অবস্থায় দেখলে “এটা আমার বিষয় নয়” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিত নয়। নিরাপদ উপায়ে তার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজন হলে ১০৯৮ বা জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, শিশু নিখোঁজ হলে অপেক্ষা করবেন না। দ্রুত পরিবারের সদস্যদের সংগঠিত করুন, আশপাশে খোঁজ নিন, শিশুর সাম্প্রতিক ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত করুন এবং দ্রুত পুলিশকে জানান।

মনে রাখবেন, আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আতঙ্কের কারণে সময় নষ্ট করা ঠিক নয়।

একটি শিশুর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাই আজই পরিবারের সবাইকে বিষয়টি জানিয়ে রাখুন—শিশু নিখোঁজ হলে প্রথম পদক্ষেপ কী হবে, কোন নম্বরে ফোন করতে হবে এবং কী তথ্য প্রস্তুত রাখতে হবে।

কারণ বিপদ আসার পর নিয়ম শেখার চেয়ে, বিপদের আগেই নিয়ম জানা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম