ইয়া রব! গুনাহ আর আমার মাঝে ওইরকম দূরত্ব তৈরি করে দিন, যেরকম আপনার রহমত আর শয়তানের মাঝে দূরত্ব!

মানুষ যতই নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা করুক, জীবনের কোনো না কোনো মুহূর্তে তার পা পিছলে যায়। কখনো চোখের মাধ্যমে, কখনো কথার মাধ্যমে, কখনো মনের গোপন কোনো ইচ্ছার মাধ্যমে—আমরা জেনে বা না জেনে এমন কিছু করে ফেলি, যা আমাদের রব পছন্দ করেন না। গুনাহের পর অনেক সময় বুকের ভেতর একটা অদৃশ্য ভার জমে থাকে। বাইরে থেকে মানুষ স্বাভাবিক থাকে, হাসে, কথা বলে, কাজ করে; কিন্তু নিজের অন্তরের কাছে সে জানে, কোথাও একটা ভুল হয়ে গেছে।

এই ভুলের অনুভূতিই কখনো কখনো মানুষকে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে আসে।

কারণ একজন মুমিনের সৌন্দর্য এই নয় যে সে কখনো ভুল করবে না। বরং সৌন্দর্য হলো—ভুল হয়ে গেলে সে ফিরে আসবে। সে নিজের অহংকারকে পাশে রেখে বলবে, “ইয়া আল্লাহ, আমি দুর্বল। আমি ভুল করেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।”

আজকের এই দোয়ার কথাটিও যেন সেই ফিরে আসার আকুতি—

“ইয়া রব! গুনাহ আর আমার মাঝে ওইরকম দূরত্ব তৈরি করে দিন, যেরকম আপনার রহমত আর শয়তানের মাঝে দূরত্ব!”

কী গভীর একটি প্রার্থনা!

আমরা সাধারণত আল্লাহর কাছে চাই—আমাদের রিজিক বাড়িয়ে দিন, বিপদ দূর করে দিন, অসুস্থতা ভালো করে দিন, দুশ্চিন্তা কমিয়ে দিন, আমাদের স্বপ্ন পূরণ করে দিন। এসব চাওয়া অবশ্যই স্বাভাবিক। কিন্তু এর পাশাপাশি যদি আমরা আল্লাহর কাছে এমন একটি হৃদয় চাই, যে হৃদয় গুনাহ থেকে দূরে থাকতে চায়—তাহলে সেটি আমাদের জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হতে পারে।

গুনাহ থেকে দূরে থাকা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

গুনাহ প্রথমে ছোট মনে হতে পারে। একটি মিথ্যা কথা, একটি খারাপ দৃষ্টি, কারও সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় কথা, কারও হক নষ্ট করা, হারাম কিছু দেখা, অহংকার করা, কারও প্রতি অন্যায় করা—এসবের কোনোটি হয়তো মুহূর্তের আনন্দ দেয়।

কিন্তু গুনাহের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, এটি ধীরে ধীরে মানুষের অন্তরকে প্রভাবিত করতে পারে।

একটি ভুল বারবার করতে করতে একসময় সেটি আর ভুল বলে মনে হয় না। তখন বিবেকের যে সতর্কতা আগে ছিল, সেটিও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। যে কাজটি প্রথমবার করতে ভয় লাগত, সেটিই একসময় স্বাভাবিক মনে হয়।

তাই গুনাহ থেকে বাঁচার সবচেয়ে সুন্দর উপায়গুলোর একটি হলো—গুনাহকে ছোট না ভাবা এবং শুরুতেই নিজেকে থামিয়ে দেওয়া।

মনে রাখতে হবে, শয়তান সাধারণত মানুষকে এক লাফে বড় অপরাধের দিকে নিয়ে যায় না। বরং ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।

আজ একটু ছাড়, কাল আরেকটু ছাড়—এভাবেই মানুষের অভ্যাস বদলে যেতে পারে।

“দূরত্ব” আসলে কী বোঝায়?

এই দোয়ায় আমরা গুনাহ ও নিজেদের মধ্যে দূরত্ব চাচ্ছি। এর অর্থ শুধু গুনাহ না করা নয়। বরং এমন একটি জীবন চাওয়া, যেখানে গুনাহের সুযোগ এলেও অন্তর সেটিকে গ্রহণ করতে চাইবে না।

ধরুন, আপনার সামনে এমন একটি সুযোগ এসেছে যেখানে কেউ দেখছে না। আপনি চাইলে অন্যায় করতে পারেন। আপনার লাভও হতে পারে। কিন্তু ঠিক তখন আপনার অন্তর বলে উঠল—

“না, আমার রব তো আমাকে দেখছেন।”

এই অনুভূতিটিই তাকওয়ার সৌন্দর্য।

মানুষ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন—এই বিশ্বাস একজন মানুষকে অনেক গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।

গুনাহ থেকে দূরত্ব তৈরি করার অর্থ তাই শুধু পরিবেশ পরিবর্তন নয়; বরং নিজের ভেতরেও আল্লাহভীতি ও আল্লাহর ভালোবাসা তৈরি করা।

আমরা কেন বারবার একই গুনাহে ফিরে যাই?

অনেক মানুষ এমন আছে যারা আন্তরিকভাবে তওবা করে। নামাজ পড়ে। চোখের পানি ফেলে। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়। কিন্তু কিছুদিন পর আবার সেই একই ভুলে ফিরে যায়।

তখন সে ভাবতে শুরু করে—

“আমার কি আর ক্ষমা হবে?”

“আমি কি খুব খারাপ মানুষ?”

“আমি এতবার তওবা করেছি, আবার একই ভুল করেছি—এখন কী হবে?”

এই হতাশাটাই বিপজ্জনক।

কারণ শয়তান চায় মানুষ যেন গুনাহ করার পর আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যায়। অথচ একজন বান্দার জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যায় না যতক্ষণ সে আন্তরিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে।

তাই ভুল হয়ে গেলে নিজেকে শেষ মনে করা যাবে না।

বরং বলতে হবে—

“আমি আবারও ফিরে আসব।”

হয়তো আজ দুর্বল হয়ে পড়েছি। কিন্তু আগামীকাল আরও সতর্ক হব।

হয়তো আজ চোখের পানি এসেছে। সেই চোখের পানিকে পরিবর্তনের শুরু বানাব।

তওবা মানে শুধু মুখে “ক্ষমা করুন” বলা নয়

তওবার মধ্যে আন্তরিকতা থাকা জরুরি। নিজের ভুলকে ভুল হিসেবে স্বীকার করতে হবে এবং সম্ভব হলে সেই গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার বাস্তব চেষ্টা করতে হবে।

তওবার একটি সুন্দর দিক হলো—এটি মানুষকে নিজের দুর্বলতা চিনতে শেখায়।

আপনি যদি কোনো নির্দিষ্ট গুনাহে বারবার পড়েন, তাহলে নিজেকে প্রশ্ন করুন:

  • আমি সাধারণত কখন এই গুনাহে জড়িয়ে পড়ি?
  • কোন পরিস্থিতিতে আমার আত্মনিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে যায়?
  • কোন মানুষ, পরিবেশ বা অভ্যাস আমাকে এই ভুলের দিকে ঠেলে দেয়?
  • আমি কি সেই পরিস্থিতি এড়ানোর চেষ্টা করছি?
  • গুনাহের পরে শুধু অনুতপ্ত হচ্ছি, নাকি কারণটিও পরিবর্তন করছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ শুধু “আমি আর করব না” বললে সব সময় পরিবর্তন আসে না। পরিবর্তনের জন্য পরিবেশ, অভ্যাস ও দৈনন্দিন জীবনেও কিছু পরিবর্তন আনতে হয়।

গুনাহ থেকে দূরে থাকতে কিছু বাস্তব অভ্যাস

আত্মশুদ্ধির পথ শুধু আবেগের নয়, অভ্যাসেরও। প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু পরিবর্তন একজন মানুষকে অনেক সাহায্য করতে পারে।

১. নামাজকে জীবনের কেন্দ্র বানান

নামাজ শুধু একটি ইবাদত নয়; এটি দিনের বারবার নিজেকে আল্লাহর সামনে দাঁড় করানোর সুযোগ। ব্যস্ততার মাঝেও নামাজ মানুষের মনে করিয়ে দেয়—সে একা নয়, তার একজন রব আছেন।

২. নিজের চোখ ও কানকে পাহারা দিন

অনেক গুনাহের শুরু হয় চোখ ও কান দিয়ে। তাই কী দেখছি, কী শুনছি এবং কোন ধরনের কনটেন্ট আমাদের সামনে আসছে—এসব বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।

৩. একাকিত্বের সময় নিজেকে বেশি সতর্ক রাখুন

অনেক মানুষ মানুষের সামনে একরকম এবং একা থাকলে আরেকরকম হয়ে যায়। অথচ প্রকৃত আত্মসংযমের পরীক্ষা অনেক সময় একাকিত্বেই হয়।

৪. ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করুন

মানুষ তার আশপাশের পরিবেশ দ্বারা অনেকটাই প্রভাবিত হয়। যারা আল্লাহকে স্মরণ করে, ভালো কাজ করতে উৎসাহ দেয় এবং অন্যায় থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে—তাদের সঙ্গ হৃদয়ের জন্য উপকারী।

৫. গুনাহের পথটি আগে থেকেই বন্ধ করুন

যে জায়গা, অ্যাপ, অভ্যাস বা পরিস্থিতি আপনাকে বারবার একই ভুলের দিকে নিয়ে যায়, সেটি থেকে দূরত্ব তৈরি করুন।

৬. প্রতিদিন নিজের হিসাব নিন

ঘুমানোর আগে কয়েক মিনিট নিজেকে প্রশ্ন করুন—আজ আমি কী ভালো করেছি? কোথায় ভুল করেছি? কারও হক নষ্ট করেছি কি? কোনো কথায় কাউকে কষ্ট দিয়েছি কি?

এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে ধীরে ধীরে সচেতন করে।

আল্লাহর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না

মানুষ গুনাহ করার পর অনেক সময় মনে করে, “আমি তো অনেক দূরে চলে গেছি।”

কিন্তু আল্লাহর রহমত মানুষের ধারণার চেয়েও বিস্তৃত।

কুরআনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হতে বলেছেন। সূরা যুমারের ৫৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ না হওয়ার জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী আশ্বাস রয়েছে।

এটি একজন গুনাহগার মানুষের জন্য আশার দরজা খুলে দেয়।

অর্থাৎ আপনি ভুল করেছেন—তাই ফিরে আসুন।

আপনি বারবার পড়ে গেছেন—তাই আবার উঠে দাঁড়ান।

আপনার অতীত খারাপ—তাই ভবিষ্যৎও খারাপ হবে, এমন নয়।

মানুষের অতীত তার পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু তওবার মাধ্যমে তার ভবিষ্যৎ বদলে যেতে পারে।

শয়তানের সবচেয়ে বড় কৌশল: হতাশা

শয়তান মানুষকে গুনাহের দিকে ডাকে—এটি আমরা জানি। কিন্তু গুনাহ করানোর পর তার আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হতে পারে মানুষকে হতাশ করে দেওয়া।

সে যেন বলে—

“তুমি তো এত গুনাহ করেছ, এখন আর আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না।”

“তুমি ভালো মানুষ নও।”

“তোমার তওবার কোনো মূল্য নেই।”

“আবারও তো তুমি একই ভুল করবে।”

এসব চিন্তার কাছে হার মানা যাবে না।

বরং মুমিনের উত্তর হওয়া উচিত—

“আমার গুনাহ যত বড়ই হোক, আমার রবের রহমত তার চেয়েও অসীম।”

তবে এই আশার অর্থ কখনোই ইচ্ছা করে গুনাহ করতে থাকা নয়। আল্লাহর রহমতের আশা করতে হবে, একই সঙ্গে গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে।

ভয় ও আশার এই ভারসাম্যই একজন মুমিনের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহর কাছে এমন হৃদয় চাইতে হবে, যে হৃদয় গুনাহকে ভালোবাসে না

আমরা অনেক সময় গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য শুধু পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে চাই। কিন্তু আরও সুন্দর হলো আল্লাহর কাছে অন্তর পরিবর্তনের দোয়া করা।

কারণ যদি অন্তরই কোনো হারাম জিনিসের প্রতি আকৃষ্ট থাকে, তাহলে সুযোগ পেলেই মানুষ দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তাই দোয়া হতে পারে—

“ইয়া আল্লাহ, শুধু আমাকে গুনাহ থেকে দূরে রাখবেন না; গুনাহের প্রতি আমার অন্তরের আকর্ষণও দূর করে দিন।”

“ইয়া আল্লাহ, যে কাজ আপনাকে অসন্তুষ্ট করে, সে কাজের প্রতি আমার মনকে অনাগ্রহী করে দিন।”

“ইয়া রব, ভালো কাজকে আমার কাছে প্রিয় করে দিন এবং অন্যায় কাজ থেকে আমার হৃদয়কে ফিরিয়ে দিন।”

এমন দোয়া একজন মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে—যদি সে দোয়ার সঙ্গে চেষ্টা চালিয়ে যায়।

গুনাহ ছাড়ার পথে ধৈর্য দরকার

কোনো অভ্যাস একদিনে তৈরি হয় না। তাই সব সময় একদিনে তা পুরোপুরি পরিবর্তন করাও সহজ নয়।

কেউ যদি বহুদিন ধরে কোনো ভুলের সঙ্গে লড়াই করে, তাকে নিজের প্রতি ধৈর্যশীল হতে হবে। তবে ধৈর্য মানে গুনাহকে মেনে নেওয়া নয়।

ধৈর্য মানে হলো—

পড়ে গেলে আবার ওঠা।

ভুল হলে আবার তওবা করা।

দুর্বল হলে আবার শক্ত হওয়ার চেষ্টা করা।

হৃদয় ভেঙে গেলে আবার আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়া।

আজ হয়তো আপনি দশবার নিজেকে সামলেছেন এবং একবার হেরে গেছেন। সেই একবারের জন্য বাকি নয়বারের চেষ্টা ভুলে যাবেন না। বরং পরের দিন আরও সতর্ক হোন।

কারও গুনাহ দেখে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাববেন না

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিজের নেক আমল দেখে অন্যকে ছোট করা যাবে না।

আজ যে ব্যক্তি গুনাহে জড়িয়ে আছে, কাল সে হয়তো আন্তরিক তওবা করে আপনার চেয়েও আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় হয়ে যেতে পারে।

আর আজ আপনি যে নেক আমল করছেন, সেটি নিয়ে অহংকার করলে আপনার জন্য বিপদ তৈরি হতে পারে।

তাই নিজের জন্য দোয়া করুন এবং অন্যের জন্যও দোয়া করুন।

বলুন—

“ইয়া আল্লাহ, আমাকে হেদায়েতের ওপর অটল রাখুন এবং যারা ভুল পথে আছে তাদেরও সঠিক পথে ফিরিয়ে দিন।”

নিজের অতীত নিয়ে লজ্জা থাকুক, কিন্তু হতাশা নয়

কিছু মানুষ অতীতের ভুলের কারণে বর্তমানের ভালো কাজও করতে চায় না। তারা মনে করে, “আমি তো এমন মানুষ ছিলাম, আমার দ্বারা ভালো কাজ কীভাবে হবে?”

এটা ভুল ধারণা।

বরং আপনার অতীতের ভুল যদি আপনাকে আজ বিনয়ী করে, তাহলে সেই অভিজ্ঞতাও আপনার জন্য শিক্ষায় পরিণত হতে পারে।

যে ব্যক্তি নিজের দুর্বলতা জানে, সে অনেক সময় অহংকার থেকে বাঁচতে পারে।

আপনার অতীত আপনাকে শেখাক—আপনি দুর্বল।

আর আপনার তওবা আপনাকে শেখাক—আল্লাহর দরজা খোলা।

দোয়ার শক্তিকে অবহেলা করবেন না

কখনো কখনো আমরা নিজের শক্তির ওপর এত বেশি নির্ভর করি যে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইতে ভুলে যাই।

অথচ একজন বান্দার আসল শক্তি হলো তার রবের ওপর নির্ভরতা।

আপনি জানেন, আপনি দুর্বল।

আপনি জানেন, আপনার নফস আপনাকে টানে।

আপনি জানেন, চারপাশে নানা ধরনের ফিতনা রয়েছে।

তাই প্রতিদিন আল্লাহর কাছে সাহায্য চান।

সকাল শুরু করুন দোয়া দিয়ে।

দিনের মধ্যে ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা করুন।

রাতে নিজের হিসাব নিন।

এবং ঘুমানোর আগে আবার আল্লাহর কাছে ফিরে যান।

এই দোয়াটি শুধু একটি সুন্দর বাক্য নয়

“ইয়া রব! গুনাহ আর আমার মাঝে ওইরকম দূরত্ব তৈরি করে দিন, যেরকম আপনার রহমত আর শয়তানের মাঝে দূরত্ব!”

এই কথাটিকে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্ট হিসেবে না দেখে নিজের জীবনের একটি প্রার্থনা বানানো যায়।

এর ভেতরে আছে—

গুনাহ থেকে বাঁচার আকুতি।

আল্লাহর রহমতের আশা।

নিজের দুর্বলতার স্বীকৃতি।

শয়তানের প্ররোচনা থেকে আশ্রয় চাওয়া।

এবং একটি পবিত্র জীবনের আকাঙ্ক্ষা।

আমরা যদি সত্যিই এই অর্থকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারি, তাহলে আমাদের প্রতিদিনের অনেক সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে।

কোনো হারাম কিছু সামনে এলে মনে হবে—“আমি তো এই দূরত্বটাই চেয়েছিলাম।”

কাউকে অন্যায়ভাবে অপমান করতে গেলে মনে হবে—“আমি তো আমার রবের সন্তুষ্টি চেয়েছিলাম।”

গোপনে ভুল করার সুযোগ এলে মনে হবে—“মানুষ না দেখলেও আমার আল্লাহ দেখছেন।”

আজ থেকেই শুরু হোক একটি নতুন চেষ্টা

নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য সব সময় বড় কোনো সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয় না। কখনো একটি ছোট সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তনের শুরু হতে পারে।

আজ একটি গুনাহ ছাড়ার চেষ্টা করুন।

আজ একটি খারাপ অভ্যাস কমিয়ে দিন।

আজ কারও হক ফিরিয়ে দিন।

আজ কাউকে ক্ষমা করুন।

আজ দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ুন।

আজ কিছু সময় কুরআন পড়ুন।

আজ একান্তে বসে নিজের রবের সঙ্গে কথা বলুন।

এবং নিজের ভাষায় বলুন—

“ইয়া আল্লাহ, আমি জানি আমি দুর্বল। আমি জানি আমার অনেক ভুল আছে। কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে দূরে যেতে চাই না। গুনাহ আর আমার মাঝে এমন দূরত্ব তৈরি করে দিন, যাতে আমি আপনার অবাধ্যতার দিকে যাওয়ার আগেই ফিরে আসতে পারি। আমার অন্তরকে পবিত্র করুন। আমার চোখকে হেফাজত করুন। আমার জবানকে হেফাজত করুন। আমার চিন্তাকে হেফাজত করুন। আমার পা যেন এমন পথে না যায়, যে পথে আপনি অসন্তুষ্ট হন।”

হয়তো এই দোয়া করার সময় আপনার চোখে পানি চলে আসবে।

হয়তো আপনি আপনার অতীতের কিছু ভুল মনে করবেন।

হয়তো মনে হবে, “আমি কতবার একই ভুল করেছি!”

তবুও থামবেন না।

আল্লাহর কাছে ফিরে আসতে লজ্জা পাবেন না।

কারণ তওবার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ কখনোই সেই মানুষের মতো নয়, যে নিজের ভুলকে ভুলই মনে করে না।

শেষ কথা

জীবন খুব ছোট। আজ আমরা আছি, কাল হয়তো থাকব না। অথচ এই অল্প সময়ের মধ্যেই আমরা কত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকি—অর্থ, সম্মান, মানুষের প্রশংসা, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা, দুশ্চিন্তা, প্রতিযোগিতা।

কিন্তু দিনের শেষে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত—

আমি আমার রবের কতটা কাছে যেতে পেরেছি?

আমার জীবন কি আমাকে আল্লাহর দিকে নিয়ে যাচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

আমি কি গুনাহকে ভয় করি?

আমি কি তওবাকে ভালোবাসি?

আমি কি আল্লাহর রহমতের আশা করি?

যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর “না” হয়, তবুও হতাশ হওয়ার কারণ নেই।

আজ থেকেই ফিরে আসা যায়।

একটি সিজদা থেকেই শুরু করা যায়।

একটি “আস্তাগফিরুল্লাহ” থেকেই শুরু করা যায়।

একটি চোখের পানি থেকেই শুরু করা যায়।

একটি সত্যিকারের দোয়া থেকেই শুরু করা যায়।

তাই আসুন, আমরা শুধু দুনিয়ার সুখের জন্য নয়, একটি পবিত্র অন্তরের জন্যও দোয়া করি।

আল্লাহ আমাদের এমন জীবন দিন, যেখানে গুনাহের পথ আমাদের কাছে কঠিন হয়ে যায় এবং নেক আমলের পথ আমাদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে।

আল্লাহ আমাদের চোখ, কান, জবান, হাত, পা ও অন্তরকে হেফাজত করুন।

আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করুন।

আল্লাহ আমাদের অতীতের ভুলগুলো ক্ষমা করুন এবং ভবিষ্যতের পথকে সুন্দর করে দিন।

আর আমাদের অন্তরের এই আর্তনাদ কবুল করুন—

“ইয়া রব! গুনাহ আর আমার মাঝে ওইরকম দূরত্ব তৈরি করে দিন, যেরকম আপনার রহমত আর শয়তানের মাঝে দূরত্ব!”

আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম