ইস্তিখারা কী? কেনো যেকোনো হালাল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইস্তিখারা করা প্রয়োজন!

মানুষের জীবনে প্রতিদিন অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কোথায় চাকরি করবেন, ব্যবসা শুরু করবেন কি না, বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করবেন কি না, কোথাও ভ্রমণে যাবেন কি না, কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুরু করবেন কি না—এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনেক সময় মানুষ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। কারণ মানুষ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানে না। কোন সিদ্ধান্তে কল্যাণ রয়েছে আর কোনটিতে অকল্যাণ রয়েছে—তা আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে ভালো জানেন।

এ কারণেই ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে ইস্তিখারা করার পদ্ধতি। ইস্তিখারা হলো কোনো বৈধ বা হালাল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে কল্যাণ কামনা করা এবং নিজের জন্য যা উত্তম, তা বেছে দেওয়ার জন্য তাঁর ওপর ভরসা করা।

ইস্তিখারা কী?

‘ইস্তিখারা’ শব্দটি আরবি ‘খাইর’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো কল্যাণ, মঙ্গল বা উত্তম কিছু চাওয়া। ইসলামী পরিভাষায় ইস্তিখারা হলো—কোনো বৈধ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আল্লাহর কাছে দোয়া করে বলা যে, তিনি যেন বান্দার জন্য যে বিষয়টি দুনিয়া ও আখিরাতের দিক থেকে কল্যাণকর, সেটিই সহজ করে দেন এবং অকল্যাণকর বিষয় থেকে দূরে রাখেন।

অর্থাৎ ইস্তিখারা মানে ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করা নয়; বরং নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে সর্বজ্ঞ আল্লাহর ওপর সিদ্ধান্তের ব্যাপারে ভরসা করা।

ইস্তিখারার শিক্ষা কোথা থেকে এসেছে?

ইস্তিখারার ব্যাপারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাদিস বর্ণনা করেছেন সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের ইস্তিখারা শেখাতেন ঠিক যেমন তিনি তাদের কোরআনের কোনো সূরা শেখাতেন।

সহিহ বুখারিতে জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করার ইচ্ছা করে, তখন সে ফরজ নামাজ ছাড়া দুই রাকাত নামাজ পড়বে। এরপর ইস্তিখারার দোয়া করবে।

রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১১৬৬ ও ৬৩৮২।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, ইস্তিখারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ।

যেকোনো হালাল বিষয়ে ইস্তিখারা কেন?

ইস্তিখারার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি হারাম বা ফরজ বিষয়ে করা হয় না। ফরজ কাজ অবশ্যই করতে হবে এবং হারাম কাজ অবশ্যই বর্জন করতে হবে। ইস্তিখারা মূলত এমন বিষয়ের ক্ষেত্রে করা হয়, যেখানে একাধিক বৈধ পথের মধ্যে কোনটি নিজের জন্য উত্তম তা নির্ধারণ করা কঠিন।

উদাহরণস্বরূপ—

  • বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ করা
  • নতুন চাকরি নেওয়া
  • ব্যবসা শুরু করা
  • কোথাও স্থানান্তর হওয়া
  • কোনো বৈধ প্রকল্প শুরু করা
  • কোনো বৈধ ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়া
  • কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈধ সুযোগ গ্রহণ করা

এসব ক্ষেত্রে মানুষ নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাইতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি ছোটখাটো হালাল কাজের আগে ইস্তিখারা করা বাধ্যতামূলক। ইস্তিখারা সুন্নাহ ও মুস্তাহাব আমল; বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এটি করা অত্যন্ত উত্তম।

ইস্তিখারা মানে কি স্বপ্ন দেখা?

ইস্তিখারা সম্পর্কে সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—ইস্তিখারা করার পর অবশ্যই স্বপ্নে উত্তর আসবে।

এটি সঠিক নয়।

সহিহ হাদিসে এমন কোনো শর্ত নেই যে ইস্তিখারা করার পর অবশ্যই স্বপ্ন দেখতে হবে। অনেক সময় মানুষ ইস্তিখারা করার পর স্বপ্নের অপেক্ষায় থাকে এবং স্বপ্ন না দেখলে মনে করে ইস্তিখারা হয়নি। এটি ঠিক নয়।

ইস্তিখারার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাওয়া এবং তাঁর ওপর ভরসা করা। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরবর্তী পরিস্থিতি, বাস্তবতার সহজতা-কঠিনতা এবং নিজের বিবেচনাও গুরুত্বপূর্ণ।

ইস্তিখারার সঙ্গে পরামর্শও করতে হবে

ইসলাম শুধু ইস্তিখারা করতে বলেনি; বরং সঠিক মানুষের সঙ্গে পরামর্শ করতেও উৎসাহিত করেছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“আর তাদের কাজকর্ম পরস্পরের পরামর্শের ভিত্তিতে হয়ে থাকে।”

—সূরা আশ-শূরা, ৪২:৩৮

অতএব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের পদ্ধতি হতে পারে—

তথ্য সংগ্রহ → অভিজ্ঞ ব্যক্তির পরামর্শ → ইস্তিখারা → আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল → সিদ্ধান্ত।

শুধু ইস্তিখারা করে বাস্তব তথ্য যাচাই না করা সঠিক পদ্ধতি নয়।

ইস্তিখারার দোয়ায় কী চাওয়া হয়?

রাসুলুল্লাহ ﷺ যে ইস্তিখারার দোয়া শিখিয়েছেন, তার মধ্যে বান্দা আল্লাহর জ্ঞান ও ক্ষমতার স্বীকৃতি দেয় এবং নিজের অজ্ঞতা ও দুর্বলতা স্বীকার করে।

দোয়ার অর্থের সারাংশ হলো:

“হে আল্লাহ! আপনার জ্ঞানের মাধ্যমে আমি আপনার কাছে কল্যাণ চাই, আপনার ক্ষমতার মাধ্যমে আমি শক্তি চাই এবং আপনার মহান অনুগ্রহ প্রার্থনা করি। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমতাবান, আমি ক্ষমতাহীন; আপনি জানেন, আমি জানি না এবং আপনিই অদৃশ্য বিষয়সমূহ সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।”

এরপর বান্দা নিজের নির্দিষ্ট বিষয় উল্লেখ করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে—যদি বিষয়টি তার দ্বীন, জীবিকা ও পরিণামের জন্য কল্যাণকর হয়, তাহলে যেন তা সহজ করে দেন এবং তাতে বরকত দেন। আর যদি তা অকল্যাণকর হয়, তাহলে যেন সেটি তার কাছ থেকে সরিয়ে দেন এবং তাকে তা থেকে দূরে রাখেন; পাশাপাশি যেখানে কল্যাণ রয়েছে তা তার জন্য নির্ধারণ করে দেন এবং তাকে তাতে সন্তুষ্ট রাখেন।

রেফারেন্স: সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৩৮২।

ইস্তিখারা আমাদের কী শিক্ষা দেয়?

ইস্তিখারা মানুষের অন্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস তৈরি করে—“আমি সব জানি না, কিন্তু আল্লাহ সব জানেন।”

মানুষ অনেক সময় কোনো বিষয়কে নিজের জন্য ভালো মনে করে। কিন্তু ভবিষ্যতে সেটিই তার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। আবার কোনো সুযোগ প্রথমে কঠিন বা অপছন্দনীয় মনে হলেও পরবর্তীতে সেটিই তার জন্য কল্যাণকর হয়ে উঠতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে; আর হতে পারে তোমরা কোনো বিষয়কে পছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য অকল্যাণ রয়েছে। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।”

—সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬

এই আয়াত ইস্তিখারার মূল দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ইস্তিখারা করার পর কী করতে হবে?

ইস্তিখারা করার পর বসে থেকে কোনো অলৌকিক সংকেতের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা করে বৈধ ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

যদি কোনো বিষয়ের ব্যাপারে তথ্য যাচাই করে, পরামর্শ নিয়ে এবং ইস্তিখারা করার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।

সিদ্ধান্তটি প্রত্যাশামতো না হলেও একজন মুমিনের বিশ্বাস থাকা উচিত—আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তাতে কোনো না কোনো কল্যাণ রয়েছে।

ইস্তিখারা কি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে রক্ষা করার নিশ্চয়তা?

ইস্তিখারা কোনো জাদুকরী পদ্ধতি নয়। এটি এমন কোনো আমলও নয় যার মাধ্যমে মানুষ ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে জেনে যায়।

বরং এটি হলো আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করার একটি সুন্নাহ। মানুষ নিজের সাধ্য অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করবে, সৎ ও অভিজ্ঞ মানুষের পরামর্শ নেবে, তারপর আল্লাহর কাছে কল্যাণ চাইবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

এভাবে ইস্তিখারা একজন মুসলিমকে অহংকার, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর অন্ধ নির্ভরতা থেকে দূরে রাখে।

বিয়ের ক্ষেত্রে ইস্তিখারা

বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইস্তিখারা বিশেষভাবে উপকারী। তবে শুধু ইস্তিখারা করেই কোনো ব্যক্তির চরিত্র, দ্বীনদারি, পরিবার বা সামঞ্জস্য যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

বরং সম্ভাব্য জীবনসঙ্গীর দ্বীনদারি, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক পরিবেশ ও বাস্তব বিষয়গুলো যাচাই করার পাশাপাশি ইস্তিখারা করা উচিত।

কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“যখন তোমাদের কাছে এমন কেউ বিবাহের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট, তাহলে তার সঙ্গে বিবাহ দাও।”

—জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ১০৮৫

অর্থাৎ ইস্তিখারা বাস্তব যাচাই-বাছাইয়ের বিকল্প নয়।

শেষ কথা

ইস্তিখারা হলো আল্লাহর কাছে নিজের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কল্যাণ চাওয়ার সুন্দর সুন্নাহ। গুরুত্বপূর্ণ কোনো হালাল বিষয়ে দ্বিধায় পড়লে একজন মুসলিম দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তিখারার দোয়া করতে পারেন। এরপর তথ্য যাচাই, পরামর্শ ও বিবেচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইস্তিখারার পর নিজের পছন্দের ফল পাওয়ার জন্য জেদ করা নয়; বরং আল্লাহ যা সহজ করেন এবং যে সিদ্ধান্তের দিকে পরিস্থিতি এগিয়ে যায়, তাতে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করা।

কারণ আমরা ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু আল্লাহ সবকিছু জানেন।

প্রধান হাদিসের রেফারেন্স:
১. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১১৬৬ — ইস্তিখারার দুই রাকাত নামাজ।
২. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৬৩৮২ — ইস্তিখারার পূর্ণ দোয়া।
৩. জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ১০৮৫ — বিবাহে দ্বীন ও চরিত্রের গুরুত্ব।
৪. সূরা আল-বাকারা, ২:২১৬ — মানুষ জানে না, আল্লাহ জানেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম