জুমার দিন মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দিন। সপ্তাহের অন্যান্য দিনের তুলনায় এই দিনে রয়েছে বিশেষ ফজিলত, রহমত ও বরকত। তাই একজন মুমিনের উচিত জুমার দিনটিকে অবহেলায় না কাটিয়ে বেশি বেশি ইবাদত, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠের মাধ্যমে অতিবাহিত করা।
জুমার দিনের এমন একটি আমল রয়েছে, যেটি খুব সহজ, কিন্তু এর ফজিলত অত্যন্ত মহান। আর সেই আমল হলো—রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
অনেক আমল হয়তো প্রতিদিন করা সম্ভব হয় না, কিন্তু দরুদ এমন একটি আমল যা হাঁটতে, বসতে, কাজের ফাঁকে কিংবা অবসর সময়ে সহজেই পড়া যায়। বিশেষ করে জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার ব্যাপারে হাদিসে বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—“জীবন গেলেও ছাড়বেন না” কথাটি এখানে উৎসাহমূলক অর্থে বলা হচ্ছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট শরিয়তসম্মত বাক্য নয় যে, জুমার দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যক দরুদ পড়তেই হবে। বরং সহিহ হাদিসে জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
জুমার দিনের বিশেষ মর্যাদা
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“সূর্য উদিত হওয়া দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন।”
এই দিনে আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে এবং এই দিনেই তাঁকে জান্নাত থেকে বের করা হয়েছে। কিয়ামতও জুমার দিনেই সংঘটিত হবে।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৫৪
এ থেকেই বোঝা যায়, জুমার দিন সাধারণ কোনো দিন নয়। তাই এ দিনের বিশেষ আমলগুলো গুরুত্বের সঙ্গে পালন করা উচিত।
জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়ার সরাসরি নির্দেশ
জুমার দিনের দরুদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এই হাদিস।
হযরত আওস ইবনু আওস আস-সাকাফি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। সুতরাং তোমরা এ দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো। কারণ তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।”
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তো ইন্তেকাল করবেন, তখনও কি আমাদের দরুদ আপনার কাছে পেশ করা হবে?”
তিনি ﷺ বললেন—
“আল্লাহ নবীদের দেহ মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।”
—সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১০৪৭
এই হাদিসটি জুমার দিনে দরুদ পাঠের বিশেষ গুরুত্ব স্পষ্ট করে। তাই জুমার দিনকে দরুদ পাঠের মাধ্যমে জীবন্ত করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত সুন্দর আমল।
একটি দরুদ, দশটি রহমত
দরুদ শরিফের সবচেয়ে বড় ফজিলতগুলোর একটি হলো—বান্দা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮
ভাবুন, আপনি যদি আন্তরিকভাবে একবার দরুদ পড়েন, আল্লাহ তাআলা আপনার প্রতি দশবার রহমত করেন। তাহলে জুমার দিনে যদি কেউ সুযোগ পেলেই দরুদ পড়তে থাকে, সে কত বিপুল রহমতের আশায় থাকতে পারে!
তবে আমলের ফজিলতকে শুধুমাত্র সংখ্যার হিসাব হিসেবে দেখা উচিত নয়। দরুদ হলো ভালোবাসা, সম্মান এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম।
দরুদ পাঠের অর্থ কী?
দরুদ শুধু মুখে কিছু শব্দ উচ্চারণের নাম নয়। এর মধ্যে রয়েছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান।
আমরা সাধারণভাবে দরুদে ইবরাহিম পড়তে পারি। নামাজের শেষ বৈঠকে যে দরুদ পড়া হয়, সেটিই দরুদে ইবরাহিমের প্রসিদ্ধ রূপ।
দরুদে ইবরাহিমের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে রাসুলুল্লাহ ﷺ ও তাঁর পরিবার-পরিজনের ওপর রহমত ও বরকত প্রার্থনা করি।
নামাজে পড়া দরুদে ইবরাহিম অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ। তাই জুমার দিন বিশেষভাবে এটি বেশি বেশি পড়া যেতে পারে।
দরুদ পাঠের সঙ্গে রাসুল ﷺ-এর ভালোবাসার সম্পর্ক
শুধু মুখে দরুদ পড়লেই হবে না; রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করার চেষ্টা করাও জরুরি।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত পাঠান। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করো।”
—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬
এই আয়াতটি দরুদের মর্যাদা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ নিজেই মুমিনদের নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ ও সালাম পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
অতএব, দরুদ কোনো সাধারণ জিকির নয়; এটি কুরআন দ্বারা নির্দেশিত একটি সম্মানিত আমল।
দরুদ পড়ার জন্য কি নির্দিষ্ট সংখ্যা আছে?
জুমার দিনে দরুদ পাঠের ক্ষেত্রে সহিহ হাদিসে এমন কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি যে অবশ্যই ১০০, ৩১৩, ১০০০ বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা পড়তে হবে।
তাই কেউ যদি বলে—“জুমার দিনে ঠিক অমুক সংখ্যক দরুদ পড়লেই অমুক ফল নিশ্চিত”—তাহলে তার দলিল যাচাই করা প্রয়োজন।
বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশ হলো “বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।”
অর্থাৎ সামর্থ্য অনুযায়ী যত বেশি পড়া যায়, তত ভালো। তবে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাকে রাসুল ﷺ-এর পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক বা নিশ্চিত সুন্নাহ হিসেবে দাবি করা ঠিক নয়, যদি তার নির্ভরযোগ্য দলিল না থাকে।
কখন দরুদ পড়বেন?
জুমার দিন দরুদ পড়ার জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়েই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে—এমন কথা নেই। দিনের বিভিন্ন সময়ে পড়তে পারেন।
যেমন—
- ফজরের পর
- কুরআন তিলাওয়াতের পর
- জুমার নামাজের আগে
- মসজিদে যাওয়ার পথে
- মসজিদে বসে অপেক্ষা করার সময়
- জুমার নামাজের পর
- আসরের পর
- সন্ধ্যার সময়
- ঘুমানোর আগে
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অন্য ফরজ ইবাদত বাদ দিয়ে শুধু দরুদে ব্যস্ত থাকা নয়।
নামাজ ফরজ। তাই ফরজ নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার পাশাপাশি দরুদ, জিকির, কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা উচিত।
জুমার দিনে দরুদের সঙ্গে আর কী আমল করবেন?
জুমার দিন শুধু দরুদ পাঠ করলেই দিনের সব আমল পূর্ণ হয়ে যায় না। বরং অন্যান্য সুন্নাহ ও নেক আমলও করার চেষ্টা করা উচিত।
১. গোসল করা
জুমার দিনে গোসল করার ব্যাপারে হাদিসে বিশেষ গুরুত্ব এসেছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে জুমার নামাজে যাওয়া মুসলমানের সুন্দর আমল।
২. উত্তম পোশাক পরা
পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরে জুমার নামাজে যাওয়া উচিত।
৩. সুগন্ধি ব্যবহার করা
সক্ষম হলে পুরুষদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করাও জুমার দিনের আদবের অন্তর্ভুক্ত।
৪. দ্রুত মসজিদে যাওয়া
জুমার নামাজের জন্য আগে আগে মসজিদে যাওয়ার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
৫. সূরা আল-কাহফ পাঠ
জুমার দিনে সূরা আল-কাহফ পাঠের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোর মান নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে; তাই এটিকে গুরুত্বপূর্ণ নফল আমল হিসেবে করা যেতে পারে, তবে দুর্বল বর্ণনাকে সহিহ বলে প্রচার করা উচিত নয়।
৬. বেশি বেশি দোয়া করা
জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে দোয়া করলে কবুল হওয়ার বিশেষ আশা রয়েছে।
সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ জুমার দিনে এমন একটি সময়ের কথা বলেছেন, যখন কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তাকে তা দান করেন।
—সহিহ বুখারি, হাদিস ৯৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৫২
তাই জুমার দিনে দরুদের পাশাপাশি নিজের, পরিবার ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করা উচিত।
দরুদ পড়ার সময় কী নিয়ত করবেন?
দরুদ পড়ার সময় মনে রাখতে পারেন—
“আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং তাঁর রাসুল মুহাম্মদ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রকাশের উদ্দেশ্যে দরুদ পাঠ করছি।”
তবে মুখে আলাদা করে নিয়ত উচ্চারণ করা জরুরি নয়। নিয়ত মূলত অন্তরের বিষয়।
দরুদ পড়ার সময় মনোযোগ রাখার চেষ্টা করুন। দ্রুত পড়ে শেষ করার চেয়ে বুঝে, ভালোবাসা ও সম্মানের সঙ্গে পড়া উত্তম।
দরুদ কি শুধু জুমার দিনই পড়তে হবে?
না। দরুদ প্রতিদিনই পড়া উচিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠের ফজিলত সব সময়ই রয়েছে।
তবে জুমার দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়ার জন্য বিশেষভাবে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। তাই জুমার দিনকে একটি “দরুদের বিশেষ দিন” হিসেবে নিজের জীবনে অভ্যাসে পরিণত করা যেতে পারে।
যে ব্যক্তি সপ্তাহের অন্যান্য দিনে ব্যস্ততার কারণে কম দরুদ পড়েন, তিনি অন্তত জুমার দিনে বেশি সময় নিয়ে দরুদ পড়ার একটি অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।
দরুদ পাঠের একটি সহজ রুটিন
জুমার দিনে চাইলে খুব সহজ একটি রুটিন করতে পারেন।
ফজরের পর কিছু সময় দরুদ পড়ুন। এরপর দিনের কাজের ফাঁকে সুযোগ পেলেই দরুদ পড়ুন। জুমার নামাজে যাওয়ার পথে দরুদ পড়তে পারেন। মসজিদে নামাজের অপেক্ষার সময়ও জিকির ও দরুদে ব্যস্ত থাকুন।
আসরের পর আবার কিছু সময় নির্ধারণ করুন। মাগরিবের পর পরিবারকে নিয়ে কুরআন, দরুদ ও দোয়ার পরিবেশ তৈরি করুন।
এভাবে একটি দিনকে দরুদ, জিকির ও ইবাদতে সুন্দরভাবে কাটানো সম্ভব।
শেষ কথা
জুমার দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া একটি বিশেষ নিয়ামত। এই দিনকে শুধু ছুটির দিন বা সামাজিক আড্ডার দিন হিসেবে না দেখে ইবাদত ও আত্মশুদ্ধির দিন হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
আর জুমার দিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
মনে রাখবেন, দরুদের জন্য কোনো জটিল আয়োজন প্রয়োজন নেই। অল্প সময়েও পড়া যায়। কাজের ফাঁকে পড়া যায়। হাঁটতে হাঁটতে পড়া যায়। অপেক্ষার সময় পড়া যায়। ঘরে বসে পড়া যায়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮
তাই আসুন, জুমার দিনটিকে দরুদে ভরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি। নির্দিষ্ট ও অপ্রমাণিত সংখ্যা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে, সহিহ হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী বেশি বেশি দরুদ পাঠ করি। একই সঙ্গে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া, তওবা ও অন্যান্য নেক আমলও পালন করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন, তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করার তাওফিক দিন এবং জুমার দিনের বরকতপূর্ণ আমলগুলো কবুল করুন। আমিন।
