সূরা মূলকের ৫টা আয়াত মৃত্যুর পরও আপনার পক্ষে কথা বলবে!

রাতের নীরবতা। চারপাশে সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। দিনের ব্যস্ততা শেষ। এমন সময় কেউ যদি একটু থেমে নিজের জীবনের কথা ভাবে, তখন হয়তো মনে হয়—আমরা আসলে কত কিছু নিয়ে ছুটছি! টাকা, বাড়ি, চাকরি, সম্মান, ভবিষ্যৎ—সবকিছুর চিন্তা আছে। কিন্তু যে মানুষটি একদিন সবকিছু রেখে একা কবরের ঘরে চলে যাবে, সেই দিনের জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত?

কুরআনের এমন কিছু সূরা আছে, যেগুলো শুধু দুনিয়ার জীবনকে সুন্দর করার কথা বলে না; বরং আখিরাতের কথাও মনে করিয়ে দেয়। সূরা আল-মুলক তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সূরা। এটি কুরআনের ৬৭ নম্বর সূরা এবং এতে ৩০টি আয়াত রয়েছে।

অনেকের মুখে আমরা শুনি—“সূরা মূলকের ৫টি আয়াত মৃত্যুর পর মানুষের পক্ষে কথা বলবে।” কথাটি খুব জনপ্রিয় হলেও এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সহিহ হাদিসে সূরা মূলকের নির্দিষ্ট ৫টি আয়াতের কথা বলা হয়নি। বরং ৩০ আয়াতের এই সূরা সম্পর্কে এমন ফজিলতের বর্ণনা এসেছে যে, এটি তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কুরআনে ৩০ আয়াতের একটি সূরা রয়েছে, যা একজন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়—সেটি হলো “তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক”, অর্থাৎ সূরা আল-মুলক।
—জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ২৮৯১

তাই শুধু পাঁচটি আয়াতের মধ্যে বিষয়টিকে সীমাবদ্ধ না করে পুরো সূরা আল-মুলকের শিক্ষা বোঝা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এই সূরার কয়েকটি আয়াত বিশেষভাবে আমাদের হৃদয় নাড়া দেয়। আজ সেই অর্থ ও শিক্ষার আলোকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে কথা বলব—যেগুলো আমাদের মৃত্যুর পরের জীবন সম্পর্কে প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে পারে।

১. “যাঁর হাতে রাজত্ব, তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান”

সূরা আল-মুলকের শুরুতেই আল্লাহ বলেন—

“বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে রাজত্ব; আর তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।”
—সূরা আল-মুলক, ৬৭:১

একবার ভেবে দেখুন, পৃথিবীতে আমরা কত কিছু নিজের বলে মনে করি।

আমার বাড়ি, আমার টাকা, আমার চাকরি, আমার ব্যবসা, আমার জমি, আমার পরিবার, আমার ক্ষমতা—এভাবে আমরা বলতেই থাকি।

কিন্তু মৃত্যুর মুহূর্তে হঠাৎ বুঝতে হয়—কোনোটিই আসলে আমার ছিল না।

যে ঘরটি বানাতে জীবনের ৩০ বছর পরিশ্রম করেছি, সেখানে হয়তো অন্য কেউ বসবাস করবে। যে ব্যাংক ব্যালেন্স নিয়ে এত চিন্তা করেছি, সেটি অন্যরা ব্যবহার করবে। যে ফোনটি সারাদিন হাতে ছিল, সেটিও আমাদের সঙ্গে কবরে যাবে না।

তাহলে আসল মালিক কে?

আল্লাহ।

এই আয়াতটি মানুষকে সেই সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

এই আয়াত থেকে আমাদের কয়েকটি শিক্ষা:

  • দুনিয়ার সম্পদ সাময়িক।
  • ক্ষমতা ও সম্মান স্থায়ী নয়।
  • জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর হাতে।
  • আমাদের কাছে যা আছে, সবই আমানত।
  • মৃত্যুর পর আমাদের সঙ্গে যাবে শুধু আমাদের আমল।

মানুষ যখন এই সত্যটি হৃদয়ে ধারণ করে, তখন তার অহংকার কমে যায়। অন্যায়ভাবে মানুষের অধিকার নষ্ট করার প্রবণতা কমে যায়। হারাম উপার্জনের প্রতি আকর্ষণ কমে আসে।

কারণ সে বুঝতে শেখে—আমিই মালিক নই; আমি একজন আমানতদার।

২. “তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন—কে উত্তম আমল করে তা পরীক্ষা করার জন্য”

সূরা আল-মুলকের দ্বিতীয় আয়াতটি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে গভীর একটি শিক্ষা দেয়।

আল্লাহ বলেন—

“যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, যাতে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করেন—কে আমলে উত্তম।”
—সূরা আল-মুলক, ৬৭:২

খেয়াল করুন, আল্লাহ বলেননি—কে সবচেয়ে বেশি সম্পদের মালিক হবে।

বলেননি—কে সবচেয়ে বিখ্যাত হবে।

বলেননি—কে সবচেয়ে বেশি মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে।

বরং বলেছেন—কে উত্তম আমল করবে।

এখানেই একজন মুমিনের জীবনের আসল হিসাব।

আমরা অনেক সময় ভাবি, আমার জীবনে এত সমস্যা কেন? কেন অন্যের জীবন এত সুন্দর? কেন আমার রিজিক কম? কেন আমার চাকরি হচ্ছে না? কেন আমার ব্যবসা চলছে না?

এসব প্রশ্নের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্ন করা দরকার—

“আমার আমল কেমন?”

আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ছি কি না?

মা-বাবার সঙ্গে কেমন আচরণ করছি?

মানুষের হক নষ্ট করছি কি না?

গোপনে গুনাহ করছি কি না?

কারও হৃদয় ভেঙে দিয়েছি কি না?

হারাম উপার্জন করছি কি না?

আল্লাহর কাছে তওবা করছি কি না?

কারণ শেষ পর্যন্ত পরীক্ষার ফলাফল হবে আমাদের আমলের ভিত্তিতে।

মৃত্যুর কথা মনে রাখার একটি সুন্দর উপায়

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন—

  • আজ আমি আল্লাহকে কতটা স্মরণ করেছি?
  • আজ আমি কারও উপকার করেছি কি?
  • আজ আমি কোনো গুনাহ করেছি কি?
  • কারও অধিকার নষ্ট করেছি কি?
  • আজ যদি আমার জীবনের শেষ রাত হতো, আমি কি প্রস্তুত থাকতাম?

এই আত্মসমালোচনা মানুষকে ধীরে ধীরে বদলে দিতে পারে।

৩. “তিনি তোমাদের পরীক্ষা করবেন—তোমরা কি দেখতে পাও?”

সূরা আল-মুলকের তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াতে আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির নিখুঁত ব্যবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করতে বলেন।

আল্লাহ বলেন—

“তিনি স্তরে স্তরে সাত আসমান সৃষ্টি করেছেন। রহমানের সৃষ্টিতে তুমি কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না।”
—সূরা আল-মুলক, ৬৭:৩

এরপর মানুষকে বারবার তাকাতে বলা হয়েছে—কোনো ত্রুটি দেখতে পায় কি না।

এখানে একটি গভীর শিক্ষা আছে।

আমরা পৃথিবীর ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যাই। অথচ আমাদের শরীর, আকাশ, পৃথিবী, রাত, দিন, বাতাস—সবকিছুই আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শন।

কখনো রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখেছেন?

অসংখ্য তারা। বিশাল আকাশ। অথচ আমরা পৃথিবীর একটি ছোট্ট অংশে দাঁড়িয়ে নিজেদের এত বড় মনে করি!

এই আয়াতগুলো মানুষকে তার অবস্থান বুঝিয়ে দেয়।

তুমি ছোট। তোমার জীবন ছোট। কিন্তু তোমার সামনে যে আখিরাত, তা অসীম।

এই উপলব্ধিই একজন মানুষকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

একটু থামুন

আমরা প্রতিদিন মোবাইলের স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকি।

কিন্তু কুরআনের দিকে কতক্ষণ তাকাই?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কত সময় চলে যায়!

কিন্তু নিজের মৃত্যুর কথা ভাবার জন্য কয়েক মিনিট সময় দিই কি?

আসলে মৃত্যুর প্রস্তুতি মানে দুনিয়া ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং দুনিয়ার মধ্যেই থেকে আখিরাতকে ভুলে না যাওয়া।

৪. “তোমরা গোপনে কথা বলো বা প্রকাশ্যে—তিনি অন্তরের কথাও জানেন”

সূরা আল-মুলকের ১৩ ও ১৪ নম্বর আয়াত বিশেষভাবে আমাদের সতর্ক করে।

আল্লাহ বলেন—

“তোমরা তোমাদের কথা গোপন করো অথবা প্রকাশ করো, নিশ্চয়ই তিনি অন্তরের বিষয় সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।”
—সূরা আল-মুলক, ৬৭:১৩

এই আয়াতটি বর্তমান সময়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ মানুষ এখন দুটি জীবন কাটায়।

একটি প্রকাশ্য জীবন।

আরেকটি গোপন জীবন।

মানুষের সামনে আমরা যে মানুষটি, একা থাকলে কি আমরা সেই মানুষটিই?

মানুষের সামনে নামাজ পড়ি, কিন্তু একা হলে গুনাহ করি কি?

মানুষের সামনে খুব ভালো মানুষ, কিন্তু গোপনে কারও অধিকার নষ্ট করি কি?

সামাজিক মাধ্যমে ধার্মিকতার কথা বলি, কিন্তু অন্তরে অহংকার জমিয়ে রাখি কি?

আল্লাহর কাছে এসব কিছুই গোপন নয়।

মানুষ আপনার মোবাইলের গ্যালারি দেখতে না পারলেও আল্লাহ জানেন।

মানুষ আপনার সার্চ হিস্ট্রি না জানলেও আল্লাহ জানেন।

মানুষ আপনার মনের কথা না বুঝলেও আল্লাহ জানেন।

এমনকি আপনি কাউকে না বলেও যে কষ্ট নিয়ে রাতে ঘুমান—আল্লাহ সেটাও জানেন।

এ কারণেই একজন মুমিনের জন্য আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে নিরাপদ সম্পর্ক।

মানুষের কাছে সব কথা বলা সম্ভব নয়।

সব কষ্ট বোঝানো সম্ভব নয়।

সব কান্নার কারণ ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।

কিন্তু আল্লাহর কাছে আপনি সব বলতে পারেন।

দোয়ায় নিজের ভাষায় কাঁদতে পারেন।

নিজের দুর্বলতা স্বীকার করতে পারেন।

তওবা করতে পারেন।

আল্লাহর কাছে নিজের কষ্ট খুলে বলতে পারেন।

৫. “তোমাদের রবকে ভয় করো এবং গোপনে তাঁকে ভয় করো”

সূরা আল-মুলকের ১২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন—

“নিশ্চয় যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।”
—সূরা আল-মুলক, ৬৭:১২

এখানে “না দেখেও” আল্লাহকে ভয় করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ আসল তাকওয়া হলো—মানুষ না দেখলেও আল্লাহকে ভয় করা।

কেউ আপনাকে দেখছে না।

আপনি একা।

গুনাহ করার সুযোগ আছে।

কেউ বাধা দেবে না।

তবুও আপনি যদি বলেন—

“না, আল্লাহ আমাকে দেখছেন।”

তখন আপনার সেই গোপন সিদ্ধান্তই আপনার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান আমলগুলোর একটি হয়ে যেতে পারে।

মানুষের প্রশংসার জন্য ইবাদত করা সহজ।

কিন্তু কেউ না জানলেও আল্লাহর জন্য ভালো কাজ করা—এটাই ইখলাসের সৌন্দর্য।

মৃত্যুর পর কী হবে?

এখানেই সূরা আল-মুলকের সঙ্গে মৃত্যুর প্রসঙ্গটি গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদিসে সূরা আল-মুলকের বিশেষ ফজিলতের কথা এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী ﷺ বলেছেন যে কুরআনের একটি ৩০ আয়াতের সূরা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করতে থাকে, যতক্ষণ না তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। সেটি হলো সূরা আল-মুলক।
—জামে‘ আত-তিরমিজি, ২৮৯১

অর্থাৎ এখানে পাঁচটি নির্দিষ্ট আয়াতের কথা নয়, পুরো ৩০ আয়াতের সূরা আল-মুলকের কথা এসেছে।

এই বিষয়টি মনে রাখা খুব জরুরি। কারণ ইসলামের কোনো আমলের ফজিলত প্রচার করার সময় সহিহ সূত্র ও দুর্বল সূত্রের পার্থক্য জানা দরকার।

তাহলে কি শুধু সূরা মূলক পড়লেই জান্নাত নিশ্চিত?

না।

এমন ধারণা ঠিক নয়।

সূরা আল-মুলকের ফজিলত আছে—কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে একজন ব্যক্তি ইচ্ছামতো গুনাহ করবে, মানুষের হক নষ্ট করবে, নামাজ ছেড়ে দেবে, তারপর শুধু সূরা আল-মুলক পড়ে সবকিছু থেকে মুক্ত হয়ে যাবে।

কুরআন আমাদের আমল, ঈমান, তওবা ও তাকওয়ার শিক্ষা দেয়।

সূরা আল-মুলক পড়ার পাশাপাশি আমাদের জীবনে এর শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে।

যেমন—

  • আল্লাহকে সর্বময় ক্ষমতার মালিক মনে করা।
  • মৃত্যুকে মনে রাখা।
  • নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
  • হারাম থেকে বেঁচে থাকা।
  • মানুষের হক আদায় করা।
  • গোপন গুনাহ থেকে দূরে থাকা।
  • নিয়মিত তওবা ও ইস্তিগফার করা।
  • কুরআন বুঝে পড়ার চেষ্টা করা।
  • আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
  • মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া।

রাতে সূরা আল-মুলক পড়ার অভ্যাস

অনেক মুসলিম রাতে ঘুমানোর আগে সূরা আল-মুলক পড়ার অভ্যাস করেন। এই অভ্যাসটি অত্যন্ত সুন্দর হতে পারে।

আপনি চাইলে রাতের একটি ছোট রুটিন তৈরি করতে পারেন।

ঘুমানোর আগে—

১. ওযু করুন।

২. মোবাইল কিছু সময়ের জন্য দূরে রাখুন।

৩. সূরা আল-মুলক ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করুন।

৪. সম্ভব হলে বাংলা অর্থ পড়ুন।

৫. আজকের ভুলগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করুন।

৬. কারও হক নষ্ট করে থাকলে তা সংশোধনের সংকল্প করুন।

৭. নিজের পরিবার, রিজিক, ঈমান ও আখিরাতের জন্য দোয়া করুন।

৮. এরপর আল্লাহর ওপর ভরসা করে ঘুমিয়ে পড়ুন।

এভাবে সূরা আল-মুলক শুধু একটি “রাতের আমল” থাকবে না; বরং আপনার জীবনের আত্মশুদ্ধির একটি অংশ হয়ে উঠবে।

একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখবেন

সূরা আল-মুলককে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় এমন অনেক কথা প্রচলিত আছে—“এই পাঁচ আয়াত পড়লে অমুক হবে”, “এতবার পড়লে অমুক নিশ্চিত হবে”, “শুধু এই কয়েকটি আয়াত পড়লেই কবরের আজাব থেকে নিশ্চিত মুক্তি”—ইত্যাদি।

এসব কথা শেয়ার করার আগে অবশ্যই সূত্র যাচাই করা উচিত।

কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে এমন কোনো কথা বলা উচিত নয়, যা তিনি বলেননি।

সূরা আল-মুলকের সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা হলো—আল্লাহর মহত্ব উপলব্ধি করা, মৃত্যুকে স্মরণ করা, নিজের আমল সংশোধন করা এবং আখিরাতের জন্য প্রস্তুত হওয়া।

মৃত্যুর পরও যে আমলগুলো উপকার করবে

একজন মানুষ যখন মারা যায়, তার দুনিয়ার কাজ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সহিহ হাদিসে এসেছে, মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি বিষয় ব্যতিক্রম—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং এমন নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৬৩১

তাই শুধু একটি সূরা পড়ার ওপর নির্ভর না করে আমাদের এমন জীবন গড়ে তোলা উচিত, যার ভালো কাজ মৃত্যুর পরও চলতে থাকে।

আপনি কাউকে কুরআন শেখালেন—সে যতদিন পড়বে, আপনার জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে।

কোনো মসজিদ, মাদরাসা বা মানুষের কল্যাণে স্থায়ীভাবে দান করলেন—তা সদকায়ে জারিয়া হতে পারে।

কাউকে ভালো একটি কথা শেখালেন—সে আমল করলে আপনার জন্যও সওয়াবের কারণ হতে পারে, আল্লাহ চাইলে।

একজন সন্তানকে ঈমান, নামাজ ও ভালো চরিত্রের শিক্ষা দিলেন—সে আপনার জন্য দোয়া করবে।

এটাই হলো এমন বিনিয়োগ, যার মূল্য দুনিয়ার টাকা দিয়ে হিসাব করা যায় না।

শেষ কথা

একদিন আমাদের প্রত্যেককেই এই পৃথিবী ছেড়ে যেতে হবে।

সেদিন আমাদের সঙ্গে যাবে না বাড়ি, গাড়ি, টাকা, জনপ্রিয়তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনুসারী।

সঙ্গে যাবে আমাদের আমল।

তাই “সূরা মূলকের ৫টা আয়াত মৃত্যুর পরও আপনার পক্ষে কথা বলবে”—এই কথাটিকে শুধু একটি আকর্ষণীয় শিরোনাম হিসেবে না দেখে এর ভেতরের বড় শিক্ষাটিকে বোঝা দরকার।

সহিহ হাদিসে সূরা আল-মুলকের ৩০ আয়াতের সুপারিশের কথা এসেছে।

আর এই সূরা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—

আল্লাহই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

জীবন ও মৃত্যু তাঁর হাতে।

আমরা পরীক্ষার মধ্যে আছি।

তিনি আমাদের প্রকাশ্য ও গোপন সবকিছু জানেন।

তাই আজ থেকেই নিজের জীবনটা একটু একটু করে বদলানো দরকার।

রাতে ঘুমানোর আগে একবার সূরা আল-মুলক খুলুন।

শুধু পড়বেন না—অর্থ বোঝার চেষ্টা করুন।

আয়াতগুলো যখন বলবে, “মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করা হয়েছে তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য”, তখন নিজের জীবনকে নতুন করে দেখুন।

যখন বলবে, “আল্লাহ অন্তরের বিষয় জানেন”, তখন নিজের গোপন জীবনটা ঠিক করুন।

যখন বলবে, “যারা না দেখেও তাদের রবকে ভয় করে তাদের জন্য ক্ষমা”, তখন মানুষের চোখের আড়ালেও আল্লাহকে ভয় করুন।

আর যখন বুঝবেন—একদিন সত্যিই এই দুনিয়া ছেড়ে যেতে হবে—তখন হয়তো দুনিয়ার অনেক অপ্রয়োজনীয় দুশ্চিন্তা নিজে থেকেই ছোট হয়ে যাবে।

আজ রাত থেকেই শুরু হোক সূরা আল-মুলকের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক।

হয়তো আমরা জানি না আমাদের জীবনের শেষ রাত কোনটি।

কিন্তু আমরা চাইলে আজকের রাতটিকে এমন একটি রাত বানাতে পারি, যেদিন আমরা আল্লাহর দিকে সত্যিকারেরভাবে ফিরে এসেছিলাম।

আল্লাহ আমাদের কুরআন পড়ার, বোঝার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দিন। আমাদের গুনাহ ক্ষমা করুন, কবরকে প্রশস্ত ও নূরে ভরিয়ে দিন এবং কিয়ামতের কঠিন দিনে তাঁর রহমত ও ক্ষমা নসিব করুন। আমিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম