সকাল- সন্ধ্যা ঘুমানোর আগে এই ৩টি সূরা পড়লে বিপদ- আপদ থেকে রক্ষা পাবেন। কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। "ইনশাআল্লাহ"

মানুষের জীবনে কখন কী বিপদ আসে, তা কেউ জানে না। রোগ-শোক, দুর্ঘটনা, শত্রুর অনিষ্ট, হিংসা-বিদ্বেষ, জিন-শয়তানের কুমন্ত্রণা কিংবা নানা অজানা ক্ষতি—সবকিছু থেকে নিরাপদ থাকতে একজন মুমিন সব সময় আল্লাহর ওপর ভরসা করেন এবং কুরআন-সুন্নাহর শেখানো আমলগুলো পালন করেন।

এর মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস নিয়মিত পাঠ করা। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার করে এই তিনটি সূরা পড়ার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে স্পষ্ট হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আবার ঘুমানোর আগে এই তিনটি সূরা পড়ে নিজের শরীরে হাত বুলিয়ে নেওয়াও নবী ﷺ-এর সুন্নাহ।

তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি—“এই তিনটি সূরা পড়লেই কেউ কোনোভাবেই ক্ষতি করতে পারবে না”—এভাবে শতভাগ দুনিয়াবি নিশ্চয়তার ভাষায় বলা ঠিক নয়। বরং হাদিসে এসেছে, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে হেফাজতের একটি শক্তিশালী আমল এবং “সবকিছুর জন্য যথেষ্ট” হওয়ার কথা। প্রকৃত রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ।


সেই তিনটি সূরা কোনগুলো?

তিনটি সূরা হলো—

১. সূরা আল-ইখলাস — সূরা ১১২
২. সূরা আল-ফালাক — সূরা ১১৩
৩. সূরা আন-নাস — সূরা ১১৪

শেষের দুটি সূরাকে একত্রে বলা হয় আল-মু‘আউয়িযাতাইন—অর্থাৎ আশ্রয় প্রার্থনার দুটি সূরা।

এই তিনটি সূরার মধ্যে বিশেষ একটি ভারসাম্য রয়েছে। সূরা ইখলাসে আল্লাহর তাওহিদ ও মহত্ত্বের ঘোষণা রয়েছে। সূরা ফালাকে বাহ্যিক ও দৃশ্যমান বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে। আর সূরা নাসে মানুষের অন্তর ও মনের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার পড়ার হাদিস

হজরত আবদুল্লাহ ইবনু খুবাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, এক বৃষ্টিমুখর অন্ধকার রাতে তারা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে খুঁজতে বের হয়েছিলেন। তাঁকে পাওয়ার পর নবী ﷺ তাকে কিছু পড়তে বলেন। পরে তিনি জিজ্ঞেস করেন, কী পড়ব? তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, সূরা ইখলাস এবং মু‘আউয়িযাতাইন—সূরা ফালাক ও সূরা নাস—সকাল ও সন্ধ্যায় তিনবার করে পড়বে; এগুলো তোমার জন্য সবকিছুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে।

এই হাদিসটি সুনান আবু দাউদ, হাদিস ৫০৮২-এ বর্ণিত হয়েছে এবং সেখানে এর মান হাসান হিসেবে উল্লেখ আছে। একই ঘটনা জামে তিরমিজি ৩৫৭৫-এও এসেছে; ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান-সহিহ বলেছেন।

এখানেই এই আমলের গুরুত্ব বোঝা যায়। রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে সাহাবিকে সকাল-সন্ধ্যার জন্য এই তিনটি সূরা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন।

কীভাবে সকাল-সন্ধ্যার আমল করবেন?

খুব সহজভাবে আমলটি করা যায়।

সকালে

ফজরের নামাজের পর বা সকাল শুরু হলে—

  • সূরা ইখলাস — ৩ বার
  • সূরা ফালাক — ৩ বার
  • সূরা নাস — ৩ বার

পড়বেন।

সন্ধ্যায়

সন্ধ্যার সময় একইভাবে—

  • সূরা ইখলাস — ৩ বার
  • সূরা ফালাক — ৩ বার
  • সূরা নাস — ৩ বার

পড়বেন।

হাদিসে “সকাল ও সন্ধ্যা তিনবার” পাঠ করার নির্দেশ এসেছে।

এখানে মনে রাখতে হবে, এটি কোনো তাবিজ নয় এবং শুধু মুখে পড়ে যান্ত্রিকভাবে শেষ করে দেওয়াই উদ্দেশ্য নয়। বরং আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রেখে, অর্থ বোঝার চেষ্টা করে এবং অন্তর থেকে তাঁর কাছে আশ্রয় চেয়ে পড়া উত্তম।

ঘুমানোর আগে কীভাবে পড়বেন?

ঘুমানোর আগে এই তিনটি সূরা পড়ারও অত্যন্ত সুন্দর একটি সুন্নাহ রয়েছে।

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ প্রতি রাতে যখন বিছানায় যেতেন, তখন তিনি তাঁর দুই হাত একত্র করতেন। এরপর সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস পড়ে দুই হাতে হালকা ফুঁ দিতেন। তারপর যতটুকু শরীরে হাত পৌঁছানো সম্ভব, ততটুকু শরীরে হাত বুলিয়ে নিতেন। তিনি মাথা, মুখ ও শরীরের সামনের অংশ থেকে শুরু করতেন এবং এভাবে তিনবার করতেন। সহিহ বুখারি ৫০১৭-এ এই হাদিস বর্ণিত হয়েছে।

অন্য একটি বর্ণনায়ও এসেছে, অসুস্থতার সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর ওপর এই আমল করার নির্দেশ দিতেন। সহিহ বুখারি ৫৭৪৮-এও এই বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে।

অর্থাৎ ঘুমানোর আগে আমলটি হবে—

প্রথম ধাপ: দুই হাতের তালু একত্র করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ুন।
তৃতীয় ধাপ: দুই হাতের তালুতে হালকা ফুঁ দিন।
চতুর্থ ধাপ: মাথা, মুখ ও শরীরের সামনের অংশসহ যতটুকু সম্ভব হাত বুলিয়ে নিন।
পঞ্চম ধাপ: এভাবে তিনবার করুন।

এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রমাণিত সুন্নাহ।

সূরা ইখলাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সূরা ইখলাসের মূল বিষয় হলো তাওহিদ—আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয়।

আল্লাহ বলেন:

قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ

“বলুন, তিনি আল্লাহ, এক।”

এই সূরা মুমিনের অন্তরে আল্লাহর একত্ব ও নির্ভরতার বিশ্বাস শক্তিশালী করে। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন অনেক সময় মানুষের ওপর, সম্পদের ওপর কিংবা নিজের শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে শুরু করে। সূরা ইখলাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—চূড়ান্ত আশ্রয় ও সাহায্যের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

তাই সকাল-সন্ধ্যায় এই সূরা পড়ার অর্থ শুধু বিপদ থেকে বাঁচার দোয়া নয়; বরং নিজের ঈমানকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কিত করার একটি দৈনিক অনুশীলন।

সূরা ফালাক কী শিক্ষা দেয়?

সূরা ফালাকে আল্লাহর কাছে বিভিন্ন ধরনের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ

“বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি প্রভাতের প্রতিপালকের।”

এরপর অন্ধকারের অনিষ্ট, বিভিন্ন সৃষ্টির অনিষ্ট, গিরায় ফুঁ দেয় এমন জাদুকরদের অনিষ্ট এবং হিংসুকের হিংসা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে।

এ কারণে সূরা ফালাক বিশেষভাবে বাহ্যিক ও প্রকাশ্য অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া।

তবে এটিকে এমনভাবে বোঝা উচিত নয় যে সূরা পড়লেই কোনো ব্যক্তি বা বিপদ কখনো বাস্তবে সামনে আসবে না। বরং মুমিন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চায় এবং বিশ্বাস করে—আল্লাহ চাইলে তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারেন, বিপদের ক্ষতি কমিয়ে দিতে পারেন অথবা বিপদের মধ্যেও তাকে ঈমানের সঙ্গে অটল রাখতে পারেন।

সূরা নাস কী শিক্ষা দেয়?

সূরা নাস মানুষের সবচেয়ে গভীর একটি শত্রুর কথা মনে করিয়ে দেয়—শয়তানের কুমন্ত্রণা।

আল্লাহ বলেন:

قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ النَّاسِ

“বলুন, আমি আশ্রয় গ্রহণ করছি মানুষের প্রতিপালকের।”

শেষে শয়তানের সেই কুমন্ত্রণা থেকে আশ্রয় চাওয়া হয়েছে, যা মানুষের অন্তরে প্রবেশ করে।

মানুষের অনেক বিপদের শুরু হয় তার চিন্তা ও অন্তর থেকে। অহংকার, সন্দেহ, হিংসা, হতাশা, অন্যায়ের প্রলোভন—এসবের মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে ভুল পথে যেতে পারে। সূরা নাস মুমিনকে শেখায়, এসব অদৃশ্য আক্রমণ থেকেও আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে।

“কেউ ক্ষতি করতে পারবে না”—এর সঠিক অর্থ কী?

অনেকে এই আমলকে প্রচার করতে গিয়ে বলেন, “এই তিনটি সূরা পড়লে কোনো শত্রু আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”

বিষয়টি একটু সতর্কভাবে বলা উচিত।

হাদিসে “তোমার জন্য সবকিছুর ক্ষেত্রে যথেষ্ট হবে”—এমন অর্থের কথা এসেছে।

এর অর্থ হলো, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে হেফাজতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল। কিন্তু আল্লাহর তাকদিরের বাইরে কোনো কিছু ঘটে না। নবী-রাসুলরাও পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। তাই আমলকে এমন কোনো যান্ত্রিক সূত্র হিসেবে দেখা ঠিক নয়, যা পড়লেই জীবনে আর কোনো বিপদ আসবে না।

বরং একজন মুমিনের বিশ্বাস হবে—

“আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় নিচ্ছি। আল্লাহই আমার প্রকৃত রক্ষাকারী। তিনি যেভাবে এবং যখন কল্যাণ মনে করবেন, সেভাবেই আমাকে রক্ষা করবেন।”

এই বিশ্বাসই তাওয়াক্কুল।

শুধু তিন সূরা নয়—জীবনেও সুন্নাহ মেনে চলতে হবে

এই আমল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন মুসলিমের নিরাপত্তার আমল শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির, দোয়া, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা—এসবও জীবনের অংশ হওয়া উচিত।

কারণ আল্লাহর হেফাজত পাওয়ার জন্য শুধু মুখের আমল নয়, জীবনের সামগ্রিক আনুগত্যও গুরুত্বপূর্ণ।

আজ থেকেই একটি সহজ রুটিন করুন

প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে মাত্র কয়েক মিনিটের একটি রুটিন তৈরি করতে পারেন।

ফজরের পর:
সূরা ইখলাস × ৩
সূরা ফালাক × ৩
সূরা নাস × ৩

সন্ধ্যায়:
সূরা ইখলাস × ৩
সূরা ফালাক × ৩
সূরা নাস × ৩

ঘুমানোর আগে:
তিনটি সূরা পড়ে দুই হাতে হালকা ফুঁ দিয়ে শরীরে হাত বুলিয়ে নিন—এভাবে তিনবার। এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আমল হিসেবে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে।

শেষ কথা

সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক ও সূরা নাস—এই তিনটি ছোট সূরা হলেও একজন মুমিনের দৈনন্দিন জীবনে এগুলোর গুরুত্ব অনেক বেশি। রাসুলুল্লাহ ﷺ সকাল-সন্ধ্যায় এগুলো তিনবার পড়তে বলেছেন এবং ঘুমানোর আগে এগুলো পড়ে শরীরে হাত বুলানোর আমল নিজে করেছেন।

তাই এগুলো শুধু বিপদের সময় পড়ার সূরা নয়; বরং প্রতিদিনের হেফাজতের সুন্নাহ আমল হিসেবে অভ্যাস করা উচিত।

মনে রাখবেন, নিরাপত্তা আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। কোনো সূরা বা আমল নিজস্ব ক্ষমতায় কাউকে রক্ষা করে না। আমরা সূরা পড়ি, দোয়া করি এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করি। তিনি চাইলে শত্রুর অনিষ্ট, হিংসা, কুমন্ত্রণা ও নানা বিপদ থেকে বান্দাকে হেফাজত করতে পারেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে সকাল-সন্ধ্যা এবং ঘুমানোর আগে এই তিনটি সূরা নিয়মিত পড়ার তাওফিক দিন, সব ধরনের অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন এবং আমাদের ঈমানের সঙ্গে নিরাপদ রাখুন। আমিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম