যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পাঠ করবে, সে কখনো দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে না

মানুষের জীবনে রিজিক, অভাব-অনটন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কেউ চাকরি হারানোর ভয়ে চিন্তিত, কেউ ব্যবসায় ক্ষতির কারণে, কেউ সংসারের ব্যয় নিয়ে। ইসলামে রিজিকের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তায়ালা। তাই একজন মুমিন অভাবের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা করেন এবং কুরআন-সুন্নাহসম্মত আমলের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন।

রিজিক বৃদ্ধির সঙ্গে সূরা আল-ওয়াকিয়াহর একটি বিশেষ সম্পর্কের কথা সমাজে বহুল প্রচলিত। বলা হয়—

“যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পাঠ করবে, সে কখনো দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে না।”

সূরা আল-ওয়াকিয়াহ কী?

সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পবিত্র কুরআনের ৫৬ নম্বর সূরা। এটি মক্কী সূরা এবং এতে মোট ৯৬টি আয়াত রয়েছে। সূরাটির শুরুতেই কিয়ামতের মহা ঘটনা এবং মানুষের পরিণতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন—

“যখন অবশ্যম্ভাবী ঘটনা সংঘটিত হবে, তখন তার সংঘটনকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ থাকবে না।”

এরপর আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে তাদের পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন—সাবিকূন বা অগ্রগামী, ডানপন্থী এবং বামপন্থী।

সূরাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—দুনিয়ার সম্পদ, ক্ষমতা ও অবস্থান চূড়ান্ত বিষয় নয়; বরং মানুষের আসল সফলতা হলো আখিরাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা।

“সূরা ওয়াকিয়াহ পড়লে দারিদ্র্য আসে না”—বর্ণনাটি কী?

সূরা আল-ওয়াকিয়াহ সম্পর্কে একটি বর্ণনা প্রচলিত আছে:

“যে ব্যক্তি প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পাঠ করবে, সে কখনো দারিদ্র্যের সম্মুখীন হবে না।”

এই বর্ণনাটি সাহাবি আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত হয়েছে বলে বিভিন্ন কিতাবে উল্লেখ পাওয়া যায়।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই বর্ণনাটি সহিহ হিসেবে প্রমাণিত নয়। হাদিস বিশারদদের একটি অংশ এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। ফলে এটিকে এমনভাবে প্রচার করা উচিত নয় যে, “রাসুলুল্লাহ ﷺ সহিহ হাদিসে নিশ্চিতভাবে বলেছেন—সূরা ওয়াকিয়াহ পড়লে কোনোদিন দারিদ্র্য হবে না।”

হাদিসের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে এমন কথা বলা, যা তিনি বলেননি, অত্যন্ত গুরুতর বিষয়।

সহিহ হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ সতর্ক করেছেন:

“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।”

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ১০৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৩

তাই সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়ার ফজিলত বলতে গিয়ে দুর্বল বর্ণনাকে সহিহ বলে প্রচার না করাই উত্তম।

তাহলে কি সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়া যাবে?

অবশ্যই যাবে। বরং কুরআনের যেকোনো সূরা তিলাওয়াতই অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“নিশ্চয়ই এই কুরআন এমন পথ দেখায়, যা সর্বাধিক সঠিক।”

—সূরা আল-ইসরা, ১৭:৯

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো। কেননা কিয়ামতের দিন তা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে।”

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮০৪

অতএব, কেউ যদি প্রতিদিন রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়েন, এটি অত্যন্ত সুন্দর একটি কুরআনি আমল। তবে তার নিয়ত হওয়া উচিত—আল্লাহর সন্তুষ্টি, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং আখিরাতের কল্যাণ লাভ করা। পাশাপাশি আল্লাহর কাছে হালাল রিজিকের দোয়া করা যাবে।

রিজিকের প্রকৃত মালিক কে?

রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“আর পৃথিবীতে এমন কোনো জীব নেই যার রিজিক আল্লাহর দায়িত্বে নেই।”

—সূরা হুদ, ১১:৬

এই আয়াত একজন মুমিনের অন্তরে গভীর আশা সৃষ্টি করে। মানুষের চাকরি, ব্যবসা, বেতন, ফসল কিংবা অন্য কোনো মাধ্যম রিজিকের বাহ্যিক কারণ হতে পারে; কিন্তু প্রকৃত রিজিকদাতা আল্লাহ।

তাই রিজিকের জন্য চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করা জরুরি।

রিজিকের জন্য কুরআনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল: ইস্তিগফার

সূরা নূহে আল্লাহ তায়ালা ইস্তিগফারের সঙ্গে দুনিয়াবি কল্যাণের সম্পর্ক উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ বলেন:

“তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগান ও নদী-নালা সৃষ্টি করবেন।”

—সূরা নূহ, ৭১:১০–১২

এখানে বোঝা যায়, ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের আমল নয়; বরং আল্লাহর রহমত ও কল্যাণ লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

তাই কেউ যদি রিজিকের সংকটে থাকেন, তাহলে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াতের পাশাপাশি নিয়মিত ইস্তিগফার করতে পারেন।

তাকওয়া ও রিজিক

আল্লাহ তায়ালা বলেন:

“যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”

—সূরা আত-তালাক, ৬৫:২–৩

এই আয়াত রিজিকের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি শিক্ষা দেয়—তাকওয়া রিজিকের বরকতের অন্যতম কারণ।

তাই শুধু একটি সূরা পড়ে বসে থাকাই ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং নামাজ, তাকওয়া, হালাল উপার্জন, ইস্তিগফার, দোয়া, সদকা এবং পরিশ্রম—সবকিছুর সমন্বয় করতে হবে।

হালাল উপার্জনের গুরুত্ব

ইসলাম অলসতা শেখায় না। একজন মুসলিমকে হালাল পথে উপার্জনের চেষ্টা করতে বলা হয়েছে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“কেউ নিজের হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম খাবার কখনো খায়নি।”

—সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ২০৭২

অর্থাৎ রিজিকের জন্য দোয়া করার পাশাপাশি বৈধ উপায়ে চেষ্টা করতে হবে।

একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা করবেন, একজন চাকরিপ্রার্থী চাকরি খুঁজবেন, একজন কৃষক জমিতে পরিশ্রম করবেন—তারপর ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবেন।

সূরা আল-ওয়াকিয়াহ কীভাবে আমল করা যেতে পারে?

কেউ চাইলে রাতে ঘুমানোর আগে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ তিলাওয়াত করতে পারেন। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনো সহিহ হাদিসে বাধ্যতামূলক সময় বা সংখ্যা প্রমাণিত নেই।

তাই এটিকে এমনভাবে বলা উচিত নয় যে—

“প্রতিদিন রাতেই নির্দিষ্ট সময়ে সূরা ওয়াকিয়াহ পড়তেই হবে, তাহলেই দারিদ্র্য দূর হবে।”

বরং বলা যায়:

“কুরআনের প্রতি ভালোবাসা ও নিয়মিত তিলাওয়াতের অভ্যাস হিসেবে রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়া যেতে পারে। তবে দারিদ্র্য দূর হওয়ার নিশ্চিত প্রতিশ্রুতি হিসেবে দুর্বল বর্ণনাটিকে সহিহ হাদিস বলা যাবে না।”

রিজিকের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি সুন্দর দোয়া হলো:

“আল্লাহুম্মাকফিনী বিহালালিকা আন হারামিক, ওয়া আগনিনী বিফাদলিকা আম্মান সিওয়াক।”

অর্থ:

“হে আল্লাহ! আপনার হালাল দ্বারা আমাকে আপনার হারাম থেকে বাঁচিয়ে রাখুন এবং আপনার অনুগ্রহ দ্বারা আমাকে আপনি ছাড়া অন্য সবার থেকে অমুখাপেক্ষী করে দিন।”

এই দোয়াটি রিজিকের ক্ষেত্রে অত্যন্ত অর্থবহ। কারণ এখানে শুধু বেশি সম্পদ চাওয়া হচ্ছে না; বরং হালাল রিজিক এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা চাওয়া হচ্ছে।

শেষ কথা

সূরা আল-ওয়াকিয়াহ নিঃসন্দেহে পবিত্র কুরআনের একটি মর্যাদাপূর্ণ সূরা। নিয়মিত এর তিলাওয়াত করা, অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং জীবনে কুরআনের শিক্ষা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত উত্তম আমল।

তবে “প্রতি রাতে সূরা আল-ওয়াকিয়াহ পড়লে কখনো দারিদ্র্য হবে না”—এই বর্ণনাটিকে সহিহ হাদিস হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয়। এ বিষয়ে বর্ণিত হাদিসের সনদ দুর্বল বলে হাদিস বিশারদদের বক্তব্য রয়েছে।

তাই একজন মুসলিমের উচিত কুরআন তিলাওয়াত করা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, নামাজ ঠিক রাখা, ইস্তিগফার করা, তাকওয়া অবলম্বন করা, হালাল পথে পরিশ্রম করা, সদকা করা এবং আল্লাহর কাছে রিজিকের জন্য দোয়া করা।

মনে রাখতে হবে—রিজিকের চাবিকাঠি কোনো একটি সূরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রিজিকের মালিক স্বয়ং আল্লাহ।

আল্লাহ বলেন:

“আর যে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”

—সূরা আত-তালাক, ৬৫:৩

তাই অভাবের সময় হতাশ না হয়ে কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করুন, ইস্তিগফার করুন, হালাল পথে চেষ্টা করুন এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখুন। আল্লাহ চাইলে অপ্রত্যাশিত স্থান থেকেও রিজিকের দরজা খুলে দিতে পারেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে হালাল, প্রশস্ত ও বরকতময় রিজিক দান করুন এবং কুরআনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর করে দিন। আমিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম