মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন চারপাশে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও ভেতরটা অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে যায়। কোনো কারণ ছাড়াই মন খারাপ থাকে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা হয়, রিজিক নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়, পরিবারের সমস্যা মাথায় ঘুরতে থাকে, কোনো সম্পর্কের টানাপোড়েন কষ্ট দেয়, আবার কখনো নিজের ভুল ও গুনাহের কথা মনে পড়ে মন ভারী হয়ে যায়। তখন মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারে না—কী করলে এই অস্থিরতা দূর হবে?
কেউ মানুষের কাছে ছুটে যায়, কেউ অর্থের পেছনে ছোটে, কেউ বিনোদনে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। কিন্তু একজন মুমিন জানেন, মানুষের দরজা সব সময় খোলা নাও থাকতে পারে; অথচ আল্লাহর দরজা সব সময় খোলা।
আর সেই দরজায় ফিরে যাওয়ার অন্যতম সুন্দর মাধ্যম হলো—ইস্তিগফার।
ইস্তিগফার অর্থ হলো আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া। আমরা যখন বলি, “আস্তাগফিরুল্লাহ”, তখন মূলত আমরা স্বীকার করি—হে আল্লাহ, আমি ভুল করেছি, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাই, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।
এটি শুধু মুখের একটি বাক্য নয়। ইস্তিগফারের মধ্যে রয়েছে নিজের দুর্বলতা স্বীকার করা, আল্লাহর সামনে বিনয়ী হওয়া এবং তাঁর রহমতের দিকে ফিরে আসা।
আবু দাউদ ১৫১৮-এর বর্ণনায় কী বলা হয়েছে?
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর দিকে এই বক্তব্যটি সম্বন্ধ করা হয়েছে:
“যে ব্যক্তি ইস্তিগফারকে নিজের অভ্যাস বানিয়ে নেয়, আল্লাহ তার প্রত্যেক সংকট থেকে বের হওয়ার পথ করে দেন, প্রত্যেক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।”
এই বর্ণনাটি সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১৫১৮-এ রয়েছে। তবে এখানে একটি বিষয় জানা জরুরি—হাদিসটির সনদ সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে এবং আলবানী (রহ.) এটিকে দুর্বল বলেছেন।
তাই “আবু দাউদ ১৫১৮” উল্লেখ করে এটিকে নিঃসন্দেহে সহিহ হাদিস বলা ঠিক হবে না। তবে ইস্তিগফারের গুরুত্ব ও ফজিলত কুরআন এবং বহু সহিহ বর্ণনায় প্রতিষ্ঠিত। ফলে এই বর্ণনায় থাকা অর্থের সঙ্গে ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষা সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, হাদিসের মান উল্লেখ করে সতর্কতার সঙ্গে তা বলা উচিত।
ইস্তিগফার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
আমরা সাধারণত মনে করি, দুশ্চিন্তার কারণ হলো টাকা-পয়সার সমস্যা, চাকরি না থাকা, ব্যবসায় ক্ষতি, সম্পর্কের সমস্যা কিংবা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা।
কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের অন্তরের অশান্তির সঙ্গে তার রবের সম্পর্কেরও গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
মানুষ যখন গুনাহ করে, তখন তার অন্তরে একটি ভার তৈরি হতে পারে। আবার যখন সে আল্লাহকে ভুলে যায়, তখন দুনিয়ার চিন্তা তার কাছে আরও বড় হয়ে ওঠে।
ইস্তিগফার মানুষকে আবার আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।
আপনি যখন বলেন—
“আস্তাগফিরুল্লাহ”
তখন আপনি যেন নিজের অন্তরকে বলছেন—আমার সমস্যা যত বড়ই হোক, আমার রব তার চেয়েও বড়। আমি ভুল করেছি, কিন্তু আমার রব ক্ষমাশীল। আমি দুর্বল, কিন্তু আমার রব শক্তিমান। আমি পথ হারিয়েছি, কিন্তু আমার রব আমাকে পথ দেখাতে পারেন।
এই বিশ্বাস একজন মানুষের হৃদয়ে নতুন শক্তি তৈরি করতে পারে।
কুরআনে ইস্তিগফারের সঙ্গে রহমত ও রিজিকের সম্পর্ক
ইস্তিগফারের গুরুত্ব শুধু হাদিসের বর্ণনায় নয়, কুরআনের বিভিন্ন আয়াতেও স্পষ্টভাবে এসেছে।
হজরত নূহ (আ.) তাঁর জাতিকে বলেছিলেন, তারা যেন তাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এরপর তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন কল্যাণের কথা উল্লেখ করেন—বৃষ্টি, সম্পদ, সন্তান এবং শক্তি বৃদ্ধির কথা।
এখান থেকে বোঝা যায়, ইস্তিগফার শুধু “গুনাহ মাফের দোয়া” হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আল্লাহর রহমত লাভের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
তবে এর অর্থ এমন নয় যে, কেউ কয়েকশ বা কয়েক হাজার বার ইস্তিগফার করলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বা নির্দিষ্ট কোনো ফল পাওয়া বাধ্যতামূলক। ইসলামে আমলকে কোনো যান্ত্রিক ফর্মুলা হিসেবে দেখা ঠিক নয়।
আল্লাহ যাকে যেভাবে এবং যখন কল্যাণ মনে করেন, সেভাবেই দেন।
দুশ্চিন্তার সময় ইস্তিগফার কেন হৃদয়কে শান্ত করে?
একবার ভেবে দেখুন—আপনি কোনো সমস্যায় পড়েছেন। সমস্যাটি আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আপনি অনেক চেষ্টা করেও সমাধান করতে পারছেন না।
এই অবস্থায় আপনি যদি শুধু সমস্যাটির দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাহলে ভয় আরও বাড়তে পারে।
কিন্তু আপনি যখন আল্লাহর দিকে ফিরে বলেন—
“আস্তাগফিরুল্লাহ, হে আল্লাহ, আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য সহজ করে দিন।”
তখন আপনার মন সমস্যার পাশাপাশি সমাধানের মালিকের দিকেও তাকায়।
এখানেই ইস্তিগফারের একটি বড় সৌন্দর্য।
এটি আপনাকে মনে করিয়ে দেয়—
- আমি একা নই।
- আল্লাহ আমার অবস্থা জানেন।
- আমার ভুলগুলো আল্লাহ জানেন।
- আমার ভবিষ্যৎও আল্লাহ জানেন।
- আমার রিজিকও আল্লাহর হাতে।
- আমার সমস্যার সমাধানও তাঁর ক্ষমতার বাইরে নয়।
এই বিশ্বাস একজন মুমিনের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়ে দিতে পারে।
ইস্তিগফার মানে শুধু “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়
অনেকে মনে করেন, ইস্তিগফার মানেই দ্রুত দ্রুত “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা।
অবশ্যই “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা একটি উত্তম জিকির। কিন্তু ইস্তিগফারের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন এর সঙ্গে অন্তরের অনুশোচনা ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসা থাকে।
ধরুন, একজন মানুষ একই গুনাহ বারবার করছে এবং মুখে শুধু “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলছে, কিন্তু গুনাহ ছাড়ার কোনো চেষ্টা করছে না।
তাহলে তার উচিত নিজের আমলকে আরও গভীরভাবে দেখা।
তওবার মধ্যে সাধারণভাবে রয়েছে—
- গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হওয়া।
- গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা।
- ভবিষ্যতে গুনাহে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করা।
- কারও অধিকার নষ্ট হলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে সংশোধন করা।
তাই ইস্তিগফার হলো শুধু জিহ্বার আমল নয়; এটি হৃদয় ও জীবনের পরিবর্তনেরও আহ্বান।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও বেশি বেশি ইস্তিগফার করতেন
ইস্তিগফারের গুরুত্ব বোঝার জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আমল আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।
সহিহ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ দিনে একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন—এমন বর্ণনা সহিহ মুসলিমে রয়েছে।
আরেক বর্ণনায় তাঁর সাহাবিরা তাঁকে মজলিসে একশবারের কাছাকাছি ইস্তিগফার করতে দেখেছেন।
এখানে একটি বিষয় আমাদের ভাবা উচিত।
যিনি ছিলেন আল্লাহর রাসুল, যাঁকে আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন, তিনিই যদি নিয়মিত ইস্তিগফার করেন, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য ইস্তিগফারের প্রয়োজন কত বেশি!
আমরা তো প্রতিদিন কত ভুল করি।
চোখের ভুল, কথার ভুল, চিন্তার ভুল, আচরণের ভুল, মানুষের হক নষ্ট করা, সময় নষ্ট করা, নামাজে অবহেলা, রাগ, অহংকার, গীবত—কত কিছুই না আমাদের জীবনে ঘটে!
তাই একজন মুমিনের জীবনে ইস্তিগফার থাকা উচিত নিয়মিত অভ্যাস হিসেবে।
“আস্তাগফিরুল্লাহ” কখন পড়বেন?
ইস্তিগফারের জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়েই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে—এমন নয়।
আপনি দিনের বিভিন্ন সময়ে ইস্তিগফার করতে পারেন।
যেমন—
- ফজরের পর কিছু সময় ইস্তিগফার করা।
- কাজের মাঝে অবসর পেলে ইস্তিগফার করা।
- গাড়ি বা বাসে বসে ইস্তিগফার করা।
- ঘুমানোর আগে ইস্তিগফার করা।
- কোনো ভুল হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
- তাহাজ্জুদের সময় ইস্তিগফার করা।
- নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সংখ্যার চেয়ে ধারাবাহিকতা এবং আন্তরিকতা।
শুধু বিপদে পড়লে নয়
আমাদের একটি সাধারণ অভ্যাস হলো—বিপদে পড়লে আল্লাহকে বেশি মনে করি।
চাকরি চলে গেলে দোয়া করি।
অসুস্থ হলে দোয়া করি।
পরীক্ষার আগে দোয়া করি।
ব্যবসায় ক্ষতি হলে দোয়া করি।
সম্পর্ক ভেঙে গেলে দোয়া করি।
কিন্তু সুস্থতা, অর্থ, পরিবার ও স্বাভাবিক জীবনের সময় আল্লাহকে অনেক সময় ভুলে যাই।
একজন মুমিনের ইস্তিগফার শুধু বিপদের সময়ের আমল হওয়া উচিত নয়।
বরং ভালো সময়েও ইস্তিগফার করা উচিত।
কারণ আপনি জানেন না—আপনার কোন ছোট গুনাহ আপনার জীবনে অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, আবার কোন আন্তরিক ইস্তিগফার আপনার জন্য আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দিতে পারে।
রিজিকের জন্য ইস্তিগফার—কীভাবে বুঝব?
অনেকে ইস্তিগফারকে শুধু অর্থ উপার্জনের একটি “আমল” হিসেবে প্রচার করেন। এভাবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ হয়ে যায়।
রিজিক মানে শুধু টাকা নয়।
রিজিক হতে পারে—
- হালাল উপার্জন।
- সুস্থতা।
- ভালো পরিবার।
- নেক সন্তান।
- ভালো বন্ধু।
- নিরাপত্তা।
- মানসিক প্রশান্তি।
- জ্ঞান।
- সময়ের বরকত।
- বিপদ থেকে রক্ষা।
- হালাল সুযোগ।
কখনো কখনো একজন মানুষ অনেক টাকা উপার্জন করেও শান্তি পায় না। আবার অন্য একজনের অর্থ সীমিত হলেও তার জীবনে শান্তি ও বরকত থাকে।
তাই ইস্তিগফারের মাধ্যমে রিজিক চাইলে শুধু “আমাকে বেশি টাকা দিন” না বলে বরং এভাবে ভাবা সুন্দর—
“হে আল্লাহ, আমাকে হালাল রিজিক দিন, তাতে বরকত দিন এবং আমার জন্য যা কল্যাণকর নয় তা থেকে আমাকে রক্ষা করুন।”
দুশ্চিন্তা দূর হওয়া মানেই সমস্যা সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যাওয়া নয়
এই বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কেউ যদি ইস্তিগফার শুরু করে এবং কয়েক দিন পরও তার সমস্যা সমাধান না হয়, তাহলে তার মনে প্রশ্ন আসতে পারে—“আমি তো ইস্তিগফার করছি, তাহলে আমার সমস্যা কেন যাচ্ছে না?”
এখানে আমাদের ঈমানি দৃষ্টিভঙ্গি দরকার।
আল্লাহর সাহায্য মানে সব সময় সমস্যাটি সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া নয়।
কখনো আল্লাহ সমস্যাটি দূর করেন।
কখনো সমস্যার সমাধানের রাস্তা খুলে দেন।
কখনো মানুষকে সেই সমস্যা মোকাবিলা করার শক্তি দেন।
কখনো বিপদের মধ্যে এমন শিক্ষা দেন, যা ভবিষ্যতে তাকে বড় ক্ষতি থেকে রক্ষা করে।
আবার কখনো এমন কিছু থেকে দূরে রাখেন, যেটিকে মানুষ নিজের জন্য ভালো মনে করেছিল।
তাই দোয়া ও ইস্তিগফারের ফলকে শুধু তাৎক্ষণিক ফল দিয়ে বিচার করা উচিত নয়।
ইস্তিগফারের সঙ্গে চেষ্টা করাও জরুরি
ইসলাম কখনো আমাদের শুধু বসে থাকতে শেখায় না।
আপনি যদি চাকরি চান, ইস্তিগফারের পাশাপাশি চাকরি খুঁজবেন।
ব্যবসায় সমস্যা হলে ইস্তিগফারের পাশাপাশি ব্যবসার ভুলগুলো বিশ্লেষণ করবেন।
পরিবারে সমস্যা হলে আল্লাহর কাছে দোয়ার পাশাপাশি নিজের আচরণও সংশোধন করবেন।
ঋণ থাকলে ইস্তিগফারের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধের বাস্তব পরিকল্পনা করবেন।
অসুস্থ হলে দোয়ার পাশাপাশি চিকিৎসা নেবেন।
অর্থাৎ—
দোয়া + ইস্তিগফার + সঠিক চেষ্টা + আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল
একজন মুমিনের জীবনের সুন্দর ভারসাম্য।
প্রতিদিনের একটি সহজ ইস্তিগফার রুটিন
আপনি চাইলে খুব সহজ একটি অভ্যাস তৈরি করতে পারেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় আল্লাহকে স্মরণ করুন। এরপর আন্তরিকভাবে ইস্তিগফার করুন।
দিনের কাজের মাঝে যখনই মনে পড়বে, বলুন—
“আস্তাগফিরুল্লাহ ওয়া আতুবু ইলাইহি।”
রাতে ঘুমানোর আগে নিজের দিনটি একটু হিসাব করুন।
আজ আমি কাকে কষ্ট দিয়েছি?
কোথায় ভুল করেছি?
কোথায় গুনাহ হয়েছে?
কোন ভালো কাজটি করতে পারতাম কিন্তু করিনি?
তারপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান।
এভাবে ইস্তিগফার শুধু একটি জিকির থাকবে না; এটি আপনার আত্মশুদ্ধির একটি পদ্ধতি হয়ে উঠবে।
গুনাহের পর হতাশ হবেন না
শয়তানের একটি বড় কৌশল হলো মানুষকে গুনাহ করানোর পর তাকে হতাশ করে দেওয়া।
মানুষ তখন ভাবতে থাকে—
“আমি এত গুনাহ করেছি, আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?”
“আমি তো বারবার একই ভুল করি।”
“আমার মতো মানুষকে আল্লাহ কেন ক্ষমা করবেন?”
এই চিন্তা থেকে দূরে থাকুন।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
আপনি যতবার ভুল করেন, ততবার আন্তরিকভাবে ফিরে আসুন।
হ্যাঁ, একই গুনাহ বারবার করা কোনোভাবেই ভালো বিষয় নয়। কিন্তু গুনাহ হয়ে গেলে তওবার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে—এমন ধারণাও ভুল।
আপনার কাজ হলো প্রতিবার সত্যিকারের অনুতপ্ত হয়ে আবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং গুনাহ থেকে বাঁচার বাস্তব চেষ্টা করা।
ইস্তিগফার মানুষকে বিনয়ী করে
নিয়মিত ইস্তিগফার করা মানুষ নিজের দুর্বলতা বুঝতে শেখে।
সে বুঝতে পারে—
“আমি সবকিছু জানি না।”
“আমি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।”
“আমার জীবনে আল্লাহর সাহায্য দরকার।”
এই উপলব্ধি অহংকার কমায়।
একজন মানুষ যত বেশি আল্লাহর সামনে নিজের প্রয়োজন অনুভব করে, তত বেশি সে বুঝতে পারে—তার প্রকৃত শক্তি আল্লাহর ওপর নির্ভরতার মধ্যে।
আজ থেকেই একটি সিদ্ধান্ত নিন
আপনার জীবন হয়তো এখন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
হয়তো চাকরি নেই।
হয়তো অর্থনৈতিক চাপ আছে।
হয়তো পরিবারে সমস্যা চলছে।
হয়তো বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
হয়তো ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় হচ্ছে।
হয়তো এমন কোনো কষ্ট আছে, যা আপনি কাউকে বলতে পারছেন না।
তাহলে আজ একটু থামুন।
ফোনটি পাশে রাখুন।
কিছু সময় একা বসুন।
আল্লাহর কথা মনে করুন।
তারপর ধীরে ধীরে বলুন—
“আস্তাগফিরুল্লাহ।”
আবার বলুন—
“আস্তাগফিরুল্লাহ।”
এবার নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে কথা বলুন।
বলুন—
“হে আল্লাহ, আমি দুর্বল। আপনি শক্তিশালী। আমি অনেক ভুল করেছি। আপনি ক্ষমাশীল। আমার অন্তরের অবস্থা আপনি জানেন। আমি জানি না আমার জন্য কী ভালো, কিন্তু আপনি জানেন। আমার গুনাহ ক্ষমা করুন। আমার দুশ্চিন্তা দূর করুন। আমার জন্য হালাল ও কল্যাণকর পথ খুলে দিন। আমার রিজিকে বরকত দিন এবং আমাকে আপনার ওপর ভরসা করার তাওফিক দিন।”
মনে রাখবেন, ইস্তিগফার কোনো জাদুর মন্ত্র নয়।
এটি আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার একটি ইবাদত।
এর উদ্দেশ্য শুধু দুনিয়ার সমস্যা সমাধান নয়; বরং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা।
শেষ কথা
আবু দাউদ ১৫১৮-এ বর্ণিত “যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে বের হওয়ার পথ এবং দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করবেন”—এই মর্মের বর্ণনাটি মুসলিম সমাজে বহুদিন ধরে আলোচিত। তবে এর সনদ দুর্বল—এ বিষয়টি উল্লেখ করা জরুরি।
তবুও ইস্তিগফারের মূল শিক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী। কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ আমাদের বারবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে, তাঁর দিকে ফিরে আসতে এবং তাঁর রহমতের আশা রাখতে শিক্ষা দেয়।
তাই ইস্তিগফারকে শুধু বিপদের সময়ের আমল বানাবেন না।
সুখের সময়ও বলুন।
দুঃখের সময়ও বলুন।
ভুল হলে বলুন।
ভুল না বুঝলেও বলুন।
রিজিকের জন্য দোয়া করার সময় বলুন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পেলে বলুন।
ঘুমানোর আগে বলুন।
সকালে বলুন।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ইস্তিগফার করার সঙ্গে নিজের জীবনকেও ধীরে ধীরে আল্লাহর পছন্দের পথে ফিরিয়ে আনুন।
হয়তো আপনি আজ যে সমস্যার সমাধান দেখতে পাচ্ছেন না, তার সমাধান আপনার ধারণার বাইরেই কোথাও রাখা আছে। হয়তো আপনার জন্য দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া আসলে অন্য একটি দরজা খোলার শুরু। আর হয়তো আপনার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু সমস্যার সমাধান নয়—আপনার রবের আরও কাছে ফিরে যাওয়া।
তাই আজ থেকেই অভ্যাস করুন—
আস্তাগফিরুল্লাহ।
কারণ মানুষ যখন নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন সে কখনোই আশাহীন থাকে না।
