আল্লাহর স্মরণ বা জিকির মুমিনের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। মানুষ যখন দুশ্চিন্তা, বিপদ, গুনাহ, অভাব কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহর জিকির তার হৃদয়কে প্রশান্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” —সূরা আর-রাদ, ১৩:২৮।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে নিয়মিত বিভিন্ন জিকির ও দোয়া করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিয়েছেন। নিচে এমন ৬টি গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও দোয়া তুলে ধরা হলো, যেগুলোর ফজিলত সহিহ হাদিসে প্রমাণিত।
গুরুত্বপূর্ণ কথা: “পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ৬টি”—এটি কোনো নির্দিষ্ট সহিহ হাদিসের শব্দ নয়। বরং সহিহ ও গ্রহণযোগ্য হাদিসে বর্ণিত অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ৬টি জিকির ও দোয়া এখানে নির্বাচন করা হয়েছে।
১. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ—তাওহিদের শ্রেষ্ঠ জিকির
জিকির:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই।
এটি ইসলামের সবচেয়ে মৌলিক ঘোষণা—আল্লাহ এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। মুমিনের ঈমানের ভিত্তিই হলো তাওহিদ।
আরও পূর্ণাঙ্গভাবে পড়া যায়:
لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই। তিনি সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান।
সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার এই জিকির পড়বে, তার জন্য ১০০টি নেকি লেখা হবে, ১০০টি গুনাহ মুছে দেওয়া হবে এবং সে দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যেও এই জিকিরের জন্য সময় রাখা অত্যন্ত মূল্যবান।
২. সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি—সহজ কিন্তু অসাধারণ ফজিলতপূর্ণ
জিকির:
سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ
উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।
অর্থ: আল্লাহ পবিত্র এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁরই।
এই ছোট্ট জিকিরের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা এবং তাঁর প্রশংসা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” বলবে, তার গুনাহ সমুদ্রের ফেনার মতো হলেও ক্ষমা করে দেওয়া হবে—যদি সে এমন বড় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে যার ব্যাপারে শরিয়তে কঠোর সতর্কতা রয়েছে। এই মর্মে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
এটি পড়তে খুব বেশি সময় লাগে না। হাঁটতে হাঁটতে, কাজের ফাঁকে, গাড়িতে বসে কিংবা অবসর সময়ে সহজেই পড়া যায়।
আর রাসুল ﷺ জিকিরের ব্যাপারে এমন একটি দৃষ্টান্ত দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি স্মরণ করে না—তাদের তুলনা জীবিত ও মৃতের মতো।
অর্থাৎ জিকির শুধু মুখের কিছু শব্দ নয়; এটি হৃদয়কে জীবিত রাখার একটি মাধ্যম।
৩. লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ—জান্নাতের গুপ্তধন
জিকির:
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
উচ্চারণ: লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
অর্থ: আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।
মানুষ অনেক সময় মনে করে—সবকিছু আমাকে নিজেকেই করতে হবে। অথচ একজন মুমিন জানে, তার সামর্থ্য, শক্তি, সফলতা—সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবি আবু মূসা আশআরী (রা.)-কে বলেছিলেন, তিনি কি তাকে জান্নাতের গুপ্তধনের একটি কথা বলে দেবেন? এরপর তিনি বলেন:
“লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।”
হাদিসটি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
তাই বিপদে, দুর্বলতায়, কঠিন কাজে, দুশ্চিন্তায় কিংবা কোনো কাজ নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে মনে হলে এই জিকিরটি পড়া যেতে পারে।
এটি মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—আমি একা নই; আমার রব আছেন।
৪. সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার—ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দোয়া
দোয়া:
اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ، خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ، وَأَنَا عَلَىٰ عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ، أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ، أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ، وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي، فَاغْفِرْ لِي، فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ
এটি দীর্ঘ হওয়ায় প্রতিদিন অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা করা উচিত।
অর্থের সারাংশ হলো:
“হে আল্লাহ! আপনি আমার রব। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমি আপনার বান্দা। আমি যথাসাধ্য আপনার অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির ওপর রয়েছি। আমি আমার কৃতকর্মের অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আপনার আমার প্রতি অনুগ্রহ স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহও স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না।”
রাসুলুল্লাহ ﷺ এটিকে সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার, অর্থাৎ ইস্তিগফারের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি বলেছেন। সহিহ বুখারি ৬৩০৬-এ এই দোয়ার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। কেউ দৃঢ় বিশ্বাসের সঙ্গে দিনে এটি পড়ে সন্ধ্যার আগে মারা গেলে জান্নাতবাসী হবে; আর রাতে পড়ে সকাল হওয়ার আগে মারা গেলেও একই ফজিলত রয়েছে।
এখানে শুধু মুখে পড়া নয়—বিশ্বাস, অনুতাপ এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসার মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল—আল্লাহই যথেষ্ট
দোয়া:
حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ
উচ্চারণ: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।
অর্থ: আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই সর্বোত্তম কর্মবিধায়ক।
এটি কুরআনের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বাক্য। আল্লাহ তাআলা সূরা আলে ইমরান ৩:১৭৩-এ মুমিনদের অবস্থা বর্ণনা করেছেন—যখন তাদের বলা হয়েছিল, শত্রুরা তাদের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছে, তখন তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি পায় এবং তারা বলে:
“হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল।”
এই বাক্যের মধ্যে রয়েছে তাওয়াক্কুল—আল্লাহর ওপর ভরসা।
তবে আল্লাহর ওপর ভরসা মানে দুনিয়ার বৈধ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়। বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করে ফলাফল আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
চাকরি নিয়ে দুশ্চিন্তা?
ব্যবসায় সমস্যা?
কোনো কঠিন পরিস্থিতি?
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়?
চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে এই দোয়া পড়া যেতে পারে।
৬. ইউনুস (আ.)-এর দোয়া—বিপদের সময় অসাধারণ একটি দোয়া
দোয়া:
لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমীন।
অর্থ: “আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম।”
এটি হজরত ইউনুস (আ.)-এর বিখ্যাত দোয়া। তিনি যখন মাছের পেটে কঠিন অবস্থায় ছিলেন, তখন আল্লাহর কাছে এই দোয়া করেছিলেন। আল্লাহ তাঁর দোয়া কবুল করেন এবং তাঁকে বিপদ থেকে উদ্ধার করেন।
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৮৭-৮৮-এ এই ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, তিনি ইউনুস (আ.)-এর দোয়া কবুল করেছিলেন এবং তাঁকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করেছিলেন; এভাবেই তিনি মুমিনদের উদ্ধার করেন।
এই দোয়ার সৌন্দর্য হলো—এখানে প্রথমে আল্লাহর একত্ব ঘোষণা করা হয়েছে, এরপর তাঁর পবিত্রতা স্বীকার করা হয়েছে এবং শেষে নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া হয়েছে।
তাই বিপদে পড়লে শুধু দুনিয়াবি সমাধান খোঁজা নয়; নিজের রবের কাছেও ফিরে আসা উচিত।
প্রতিদিন কীভাবে এই ৬টি জিকিরের অভ্যাস করবেন?
একসঙ্গে অনেক কিছু শুরু করে কয়েক দিন পর ছেড়ে দেওয়ার চেয়ে ধীরে ধীরে নিয়ম তৈরি করা ভালো।
সকালে:
- সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার ১ বার
- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ...” ১০০ বার
- “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি” ১০০ বার
দিনের বিভিন্ন সময়:
- “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ”
- “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকিল”
বিপদ বা দুশ্চিন্তার সময়:
- ইউনুস (আ.)-এর দোয়া বেশি বেশি পড়ুন।
তবে মনে রাখতে হবে, নির্দিষ্ট সংখ্যাকে শরিয়ত-নির্ধারিত মনে করা যাবে না, যদি সেই সংখ্যা সংশ্লিষ্ট সহিহ দলিলে নির্ধারিত না থাকে। যে জিকিরের জন্য হাদিসে নির্দিষ্ট সংখ্যা এসেছে, সেখানে সেই সংখ্যা অনুসরণ করা উত্তম।
শুধু জিকির নয়—জীবনেও তার প্রভাব আনুন
জিকিরের উদ্দেশ্য শুধু বেশি বেশি শব্দ উচ্চারণ করা নয়। জিকির মানুষের আচরণ ও হৃদয় পরিবর্তন করবে—এটাই গুরুত্বপূর্ণ।
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়লে আল্লাহর একত্বের প্রতি বিশ্বাস আরও দৃঢ় হওয়া উচিত।
“সুবহানাল্লাহ” পড়লে আল্লাহর মহত্ত্ব উপলব্ধি করা উচিত।
“লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” পড়লে অহংকার কমে যাওয়া উচিত।
ইস্তিগফার পড়লে গুনাহ ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
“হাসবুনাল্লাহ” পড়লে আল্লাহর ওপর ভরসা বৃদ্ধি পাওয়া উচিত।
আর ইউনুস (আ.)-এর দোয়া পড়লে নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি হওয়া উচিত।
শেষ কথা
দুনিয়ার ব্যস্ততা আমাদের আল্লাহকে ভুলিয়ে দিতে পারে। অথচ কয়েক মিনিটের জিকিরই একজন মানুষের দিনকে বরকতময় করে তুলতে পারে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি স্মরণ করে না—তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো।
তাই এই ৬টি জিকির ও দোয়াকে শুধু পড়ার তালিকায় না রেখে জীবনের অংশ বানানোর চেষ্টা করুন।
মনে রাখবেন—আল্লাহর রহমত পাওয়ার জন্য শুধু জিকিরই যথেষ্ট এমন নয়; ফরজ ইবাদত, তওবা, হালাল-হারাম মেনে চলা এবং মানুষের হক আদায় করাও জরুরি। জান্নাত লাভ শেষ পর্যন্ত আল্লাহর রহমতের ওপর নির্ভরশীল। সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মানুষের আমল একাই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে না; আল্লাহর রহমতই মূল বিষয়।
আজ থেকেই শুরু করুন।
হয়তো কয়েক মিনিটের এই জিকিরই আপনার হৃদয়কে আল্লাহর আরও কাছে নিয়ে যাবে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে বেশি বেশি জিকির, দোয়া, তওবা ও নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
