দাঁড়িয়ে পানি পান করার শাস্তি কতটা ভয়াবহ! আপনি যদি জানতেন?

পানি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য এক মহান নিয়ামত। প্রতিদিন আমরা অসংখ্যবার পানি পান করি। কিন্তু একজন মুমিনের জীবনে শুধু কী খাচ্ছি বা পান করছি—এটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে খাচ্ছি বা পান করছি, সেটিও সুন্নাহর আলোকে গুরুত্বপূর্ণ।

দাঁড়িয়ে পানি পান করা নিয়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে একাধিক সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এসব হাদিসে কখনো দাঁড়িয়ে পান করতে নিষেধ করা হয়েছে, আবার অন্য সহিহ হাদিসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেও কোনো কোনো পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে পানি পান করেছেন। তাই বিষয়টি বুঝতে হলে সব হাদিস একসঙ্গে দেখতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—“দাঁড়িয়ে পানি পান করলে নিশ্চিত কোনো ভয়াবহ শাস্তি হবে” এমন কথা সহিহ হাদিসে সরাসরি প্রমাণিত নয়। বরং হাদিসে দাঁড়িয়ে পান করা থেকে নিষেধ ও অপছন্দের কথা এসেছে। পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে পান করার অনুমতিও প্রমাণিত।

দাঁড়িয়ে পানি পান করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা

হজরত আনাস ইবনু মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে পান করা থেকে নিষেধ করেছেন।

সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে:

“নবী ﷺ দাঁড়িয়ে পান করা থেকে নিষেধ করেছেন।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৪a, কিতাবুল আশরিবা, হাদিস ১৪৮

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হাদিসে শুধু সাধারণভাবে অপছন্দের কথা বলা হয়নি; বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে পান করা থেকে নিষেধ করেছেন। তাই একজন মুসলমানের জন্য বসে পানি পান করাই উত্তম ও সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি।

“ভুলে দাঁড়িয়ে পান করলে বমি করে দেবে”—এই হাদিসের ব্যাখ্যা

দাঁড়িয়ে পানি পান করার বিষয়ে সবচেয়ে আলোচিত হাদিসটি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমাদের কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। আর যে ভুলে পান করে ফেলে, সে যেন তা বমি করে দেয়।”

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৬, কিতাবুল আশরিবা, হাদিস ১৫৩

এই হাদিসটি দেখে অনেকে মনে করেন, দাঁড়িয়ে পানি পান করলেই অবশ্যই কঠিন শাস্তি হবে। কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়।

হাদিসটির শব্দ ও অন্যান্য সহিহ বর্ণনা একত্রে বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে পান করার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর সতর্কতা দিয়েছেন। তবে এটিকে এমনভাবে প্রচার করা ঠিক নয় যে, দাঁড়িয়ে একবার পানি পান করলেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো দুনিয়াবি বা আখিরাতের শাস্তি অবধারিত।

তাহলে কি দাঁড়িয়ে পানি পান করা হারাম?

এখানে আলেমদের মধ্যে ফিকহি ব্যাখ্যার পার্থক্য রয়েছে। অনেক আলেম হাদিসগুলোর সমন্বয় করে বলেছেন, সাধারণ অবস্থায় বসে পানি পান করা উত্তম এবং দাঁড়িয়ে পান করা মাকরূহ/অপছন্দনীয়; আবার প্রয়োজন বা বিশেষ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে পান করার বৈধতার প্রমাণ রয়েছে।

এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই দাঁড়িয়ে পানি পান করেছেন।

রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই দাঁড়িয়ে পানি পান করেছেন

হজরত ইবনু আব্বাস (রা.) বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জমজমের পানি পান করিয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ তখন দাঁড়িয়ে জমজমের পানি পান করেছিলেন।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৭a, কিতাবুল আশরিবা, হাদিস ১৫৪

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ জমজমের পানি একটি বালতি থেকে দাঁড়িয়ে পান করেছিলেন।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৭b

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যদি দাঁড়িয়ে পানি পান করা সর্বাবস্থায় হারাম হতো, তাহলে রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে তা করতেন না।

হজরত আলী (রা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা

সহিহ বুখারিতে একটি চমৎকার ঘটনা এসেছে।

হজরত আলী (রা.) দাঁড়িয়ে পানি পান করলেন। এরপর তিনি বললেন, কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে পানি পান করাকে অপছন্দ করেন। কিন্তু তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে দাঁড়িয়ে পানি পান করতে দেখেছেন।

সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৬১৫, কিতাবুল আশরিবা

আরেক বর্ণনায় দেখা যায়, হজরত আলী (রা.) বসে পানি পান করার পর অবশিষ্ট পানি দাঁড়িয়ে পান করেন এবং বলেন, তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে এমন করতে দেখেছেন।

সহিহ আল-বুখারি, হাদিস ৫৬১৬

অর্থাৎ দাঁড়িয়ে পানি পান করার ব্যাপারে হাদিসগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে বিভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু সবগুলো একত্রে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হয়।

তাহলে এত কঠোরভাবে নিষেধ কেন?

রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন কোনো কাজ থেকে সতর্ক করেন, তখন একজন মুমিনের উচিত সেই সতর্কতাকে গুরুত্ব দেওয়া।

দাঁড়িয়ে পানি পান করার নিষেধাজ্ঞার অন্যতম শিক্ষা হলো আদব ও সুন্নাহ অনুসরণ

একজন মুসলমানের জীবনে সুন্নাহ শুধু বড় বড় ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। খাবার খাওয়া, পানি পান করা, ঘুমানো, মানুষের সঙ্গে কথা বলা—জীবনের ছোট ছোট কাজেও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আদর্শ অনুসরণ করা সম্ভব।

তাই বসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অভ্যাসবশত দাঁড়িয়ে পানি পান না করে বসে পানি পান করা একজন মুমিনের জন্য উত্তম।

“পেটে পাথর হয়ে যায়”—এমন কথা কি সহিহ?

দাঁড়িয়ে পানি পান করলে পেটে পাথর হয়ে যাবে, কিডনি নষ্ট হবে বা শরীরে নিশ্চিত কোনো ভয়াবহ রোগ হবে—এ ধরনের অনেক কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত।

কিন্তু এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিস হিসেবে নির্দিষ্ট প্রমাণ দেওয়া ঠিক নয়।

ইসলামের কোনো আমলের ফজিলত বা শাস্তি সম্পর্কে কথা বলার সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নামে এমন কথা বলা অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়। যা হাদিসে নেই, তা হাদিস হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।

“ভুলে করলে কী হবে?”

সহিহ মুসলিমের হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কেউ ভুলে দাঁড়িয়ে পান করলে বমি করে দেওয়ার কথা।

তবে এই হাদিসের কারণে মানুষকে আতঙ্কিত করারও দরকার নেই। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হলে বা বমি করলে তার শারীরিক ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নিজে থেকে এমন কিছু করা উচিত নয়।

হাদিসের বক্তব্যকে বুঝতে হবে তার পূর্ণ প্রেক্ষাপট ও আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে।

কখন দাঁড়িয়ে পানি পান করা যেতে পারে?

সহিহ হাদিস থেকেই বোঝা যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে পানি পান করা বৈধ হতে পারে।

যেমন—

  • বসার সুযোগ না থাকা;
  • ভিড়ের মধ্যে থাকা;
  • পানি সংগ্রহের পরিস্থিতি;
  • কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকা;
  • জমজমের পানি পান করার মতো বিশেষ পরিস্থিতি।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর জমজমের পানি দাঁড়িয়ে পান করার ঘটনা সহিহ মুসলিমে স্পষ্টভাবে এসেছে।

সুতরাং বলা যাবে না যে “দাঁড়িয়ে পানি পান করলেই হারাম এবং নিশ্চিত শাস্তি হবে।”

বরং বলা অধিক সঠিক—সাধারণ অবস্থায় বসে পানি পান করা উত্তম ও সুন্নাহর কাছাকাছি; দাঁড়িয়ে পান করা সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞামূলক হাদিস রয়েছে, আবার বৈধতার প্রমাণও রয়েছে।

পানি পান করার সুন্নাহ কী?

পানি পান করার সময় কয়েকটি সুন্দর আদব পালন করা যায়।

১. সম্ভব হলে বসে পানি পান করা

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিষেধাজ্ঞামূলক হাদিসের কারণে সাধারণ অবস্থায় বসে পানি পান করাই উত্তম।

২. আল্লাহর নাম নিয়ে পান করা

পানি পান করার আগে “বিসমিল্লাহ” বলা উচিত।

৩. ধীরে ধীরে পান করা

একবারে গলাধঃকরণ না করে ধীরে পানি পান করা উত্তম।

৪. পানি পান করার পর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা

পানি আল্লাহর বিরাট নিয়ামত। তাই পান করার পর আলহামদুলিল্লাহ বলা উচিত।

৫. অপচয় না করা

প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা উচিত নয়। পানি আল্লাহর নিয়ামত—তাই এর প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকা জরুরি।

আসল শিক্ষা কোথায়?

এই বিষয়টির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একজন মুমিনের জীবনে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহকে সম্মান করা।

আপনি যদি বসে পানি পান করতে পারেন, তাহলে বসেই পান করুন। কারণ এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিষেধাজ্ঞামূলক বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অধিক সতর্কতার পথ।

কিন্তু কেউ দাঁড়িয়ে পানি পান করে ফেললে তাকে এমনভাবে বলা ঠিক নয় যে, “তুমি মহাপাপ করেছ, তোমার ওপর ভয়াবহ শাস্তি আসবে”—যদি তার জন্য এমন নির্দিষ্ট শাস্তির সহিহ প্রমাণ না থাকে।

ইসলামের বক্তব্যকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করাও দ্বীনের আমানত।

শেষ কথা

দাঁড়িয়ে পানি পান করার বিষয়ে সহিহ হাদিসে স্পষ্ট সতর্কতা রয়েছে। আনাস (রা.)-এর বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ ﷺ দাঁড়িয়ে পান করা থেকে নিষেধ করেছেন এবং আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনায় আরও কঠোর ভাষা এসেছে।

কিন্তু একই সঙ্গে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে প্রমাণিত যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ জমজমের পানি দাঁড়িয়ে পান করেছেন, এবং আলী (রা.)-ও রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে দাঁড়িয়ে পান করতে দেখেছেন।

তাই বিষয়টির ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো:

সুযোগ থাকা অবস্থায় বসে পানি পান করা উত্তম। দাঁড়িয়ে পান করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সতর্কতাকে হালকা করে দেখা উচিত নয়। তবে দাঁড়িয়ে পানি পান করলেই নিশ্চিত কোনো ভয়াবহ শাস্তি হবে—এমন দাবি সহিহ হাদিসের আলোকে করা যাবে না।

আমাদের উচিত ভয় দেখানোর চেয়ে সুন্নাহ শেখা, বুঝে আমল করা এবং অন্যদেরও সহিহ দলিলের ভিত্তিতে আমল করতে উৎসাহিত করা।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ভালোভাবে বোঝার এবং জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি কাজে তা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম