সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য এক মহান আমানত। সন্তান অসুস্থ হলে বাবা-মায়ের দুশ্চিন্তার কোনো সীমা থাকে না। বিশেষ করে হাম (Measles)-এর মতো সংক্রামক রোগের কথা শুনলে অনেক অভিভাবক ভয় পেয়ে যান।
ইসলাম আমাদের শুধু দোয়া করতে শেখায়নি; বরং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সতর্কতা অবলম্বন করতেও উৎসাহিত করেছে।
সন্তানের জন্য একটি অত্যন্ত সুন্দর ও প্রমাণিত দোয়া রয়েছে, যা রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর নাতি হাসান (রা.) ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য পড়তেন। এই দোয়াটি বিপদ, ক্ষতিকর প্রাণী, শয়তান ও কুদৃষ্টিসহ বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়ার দোয়া।
🌿 সন্তানকে যে দোয়াটি পড়ে ফুঁ দিতে পারেন
দোয়াটি হলো—
أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ
উচ্চারণ:
“আ‘ঊযু বিকালিমাতিল্লাহিত্-তাম্মাতি মিন কুল্লি শাইত্বানিওঁ ওয়া হাম্মাতিন, ওয়া মিন কুল্লি ‘আইনিন লাম্মাহ।”
অর্থ:
“আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীসমূহের মাধ্যমে প্রত্যেক শয়তান, প্রত্যেক বিষাক্ত/ক্ষতিকর প্রাণী এবং প্রত্যেক ক্ষতিকর কুদৃষ্টির অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”
📖 হাদিসের প্রমাণ
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এই দোয়া পড়ে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। তিনি বলতেন, তাঁদের পিতা ইবরাহিম (আ.) ইসমাঈল ও ইসহাক (আ.)-এর জন্যও এভাবে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস ৩৩৭১।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ। অর্থাৎ বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের জন্য এই দোয়া পড়ে আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা চাইতে পারেন।
🌸 কীভাবে সন্তানকে দোয়া পড়ে ফুঁ দেবেন?
দোয়া পড়ার সময় অন্তরে বিশ্বাস রাখতে হবে—শিফা ও নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
আপনি সন্তানের কাছে বসে দোয়াটি পড়তে পারেন। এরপর হালকা ফুঁ দিতে পারেন। চাইলে শিশুর মাথা বা শরীরে স্নেহের সঙ্গে হাত রাখতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থতার সময় কুরআনের মু‘আউয়িযাত—সূরা আল-ফালাক ও সূরা আন-নাস—পড়ে নিজের ওপর ফুঁ দিতেন। অসুস্থতা বেশি হলে আয়িশা (রা.) তাঁর ওপর পড়ে ফুঁ দিতেন। সহিহ বুখারি ৫৭৩৫।
এ থেকে বোঝা যায়, কুরআন ও মাসনূন দোয়ার মাধ্যমে রুকইয়া করা শরিয়তসম্মত।
তবে মনে রাখতে হবে, এই দোয়াকে হামের নির্দিষ্ট চিকিৎসা হিসেবে দাবি করা ঠিক নয়। হাদিসে এটিকে “হাম রোগের বিশেষ দোয়া” বলা হয়নি।
🕊️ অসুস্থ হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া
সন্তান অসুস্থ হয়ে পড়লে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো এই শিফার দোয়াটিও পড়তে পারেন—
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَأْسَ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا
উচ্চারণ:
“আল্লাহুম্মা রব্বান্-নাস, আযহিবিল-বা'সা, ওয়াশফি আনতাশ-শাফি, লা শিফা'আ ইল্লা শিফাউক, শিফা'আন লা ইউগাদিরু সাকামা।”
অর্থ:
“হে মানুষের প্রতিপালক আল্লাহ! কষ্ট দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্যদাতা। আপনার আরোগ্য ছাড়া কোনো আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দান করুন, যা কোনো রোগ অবশিষ্ট রাখে না।”
রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ ব্যক্তির জন্য এই দোয়া করতেন। এটি সহিহ বুখারি ৫৭৪৩-এ বর্ণিত হয়েছে।
আর আনাস (রা.)-এর কাছে অসুস্থতার কথা জানালে তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর রুকইয়ার এই দোয়াটিই পড়ে শোনাতেন। সহিহ বুখারি ৫৭৪২।
🌙 সকাল-বিকাল পড়া যাবে কি?
এই দোয়াটি সন্তানের জন্য পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া অবশ্যই উত্তম আমল।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা দরকার—
“সকাল-বিকাল অবশ্যই অমুক সংখ্যায় এই দোয়া পড়তে হবে এবং এতে হাম হবে না”—এমন নির্দিষ্ট সহিহ হাদিস পাওয়া যায় না।
তাই এটিকে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্ধারিত সকাল-বিকালের আমল হিসেবে প্রচার না করে বলা উত্তম—
সন্তানের নিরাপত্তা ও সুস্থতার জন্য বাবা-মা এই মাসনূন দোয়াটি পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে পারেন।
আল্লাহর কাছে দোয়া করার কোনো ক্ষতি নেই; বরং দোয়া মুমিনের অন্যতম শক্তিশালী ইবাদত।
🩺 শুধু দোয়া নয়—চিকিৎসাও নিতে হবে
এখানেই ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বুঝতে হবে।
দোয়া করা মানে চিকিৎসা বাদ দেওয়া নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ চিকিৎসা গ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন। তাই কোনো শিশু হামে আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
দোয়া করবেন—
আবার চিকিৎসাও করবেন।
তাওয়াক্কুল মানে উপায় ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং বৈধ উপায় গ্রহণ করে ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়া।
⚠️ হামের ক্ষেত্রে সতর্কতা কেন জরুরি?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিতে পারে।
তাই শিশুর মধ্যে এমন লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিশেষ করে শিশুর—
- শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
- অতিরিক্ত দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া
- পানি বা দুধ খেতে না পারা
- খিঁচুনি
- অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব
- খুব বেশি জ্বর
- শ্বাসকষ্ট বা অন্যান্য গুরুতর উপসর্গ
দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
দোয়া চিকিৎসার বিকল্প নয়।
💉 টিকাদানের বিষয়টিও ভুলবেন না
শিশুকে সংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে টিকাদান গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
তাই আপনার সন্তানের বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত হাম/এমআর বা এমএমআর টিকা এবং অন্যান্য রুটিন টিকা যথাসময়ে নেওয়া হয়েছে কি না, তা স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের সঙ্গে যাচাই করুন।
কেউ যদি শুধু “দোয়া পড়লেই হবে” বলে চিকিৎসা বা টিকাদান বাদ দিতে বলেন, তাহলে সেটি ইসলামের সঠিক ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা নয়।
🤲 সন্তানকে রক্ষা করার সুন্দর একটি আমল
বাবা-মা চাইলে প্রতিদিন সন্তানের জন্য—
১. এই মাসনূন দোয়াটি পড়তে পারেন।
২. সূরা আল-ফাতিহা পড়তে পারেন।
৩. সূরা আল-ইখলাস, আল-ফালাক ও আন-নাস পড়ে রুকইয়া করতে পারেন।
৪. সন্তানের সুস্থতার জন্য নিজের ভাষায়ও আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন।
৫. সন্তান অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজে অসুস্থ অবস্থায় মু‘আউয়িযাত পড়ে ফুঁ দিতেন—এটি সহিহ বুখারির হাদিসে প্রমাণিত।
❤️ সবচেয়ে বড় ভরসা—আল্লাহ
সন্তানের অসুস্থতা বাবা-মায়ের জন্য অত্যন্ত কষ্টের পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু একজন মুমিন জানেন—রোগও আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয় এবং শিফাও তাঁরই হাতে।
আল্লাহ বলেন—
“আর আমি যখন অসুস্থ হই, তখন তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।”
—সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৮০
তাই সন্তান অসুস্থ হলে আতঙ্কিত না হয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসুন।
সন্তানের মাথায় হাত রেখে বলুন—
“হে আল্লাহ, আমার সন্তানকে সব ধরনের রোগ-বালাই, বিপদ-আপদ ও অনিষ্ট থেকে হেফাজত করুন। তাকে পূর্ণ সুস্থতা দান করুন। তার রোগকে তার জন্য কল্যাণের কারণ বানিয়ে দিন এবং আমাদেরকে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণের তাওফিক দিন।”
তারপর মাসনূন দোয়া পড়ুন, হালকা ফুঁ দিন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করুন।
🌿 শেষ কথা
সন্তানের জন্য “أَعُوذُ بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ…” দোয়াটি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি মাসনূন দোয়া। কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর জন্য এটি পড়ে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। সহিহ বুখারি ৩৩৭১।
তবে এটিকে “হাম রোগের নিশ্চিত প্রতিষেধক” বলা যাবে না। বরং সুন্নাহর শিক্ষা অনুযায়ী—
দোয়া করুন 🤲
রুকইয়া করুন 📖
সতর্ক থাকুন 🛡️
প্রয়োজনে চিকিৎসা নিন 🩺
এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন ❤️
আল্লাহ আমাদের সকল সন্তানকে সুস্থতা, নিরাপত্তা ও ঈমানের সঙ্গে দীর্ঘ জীবন দান করুন। আমিন।
