যারা সবসময় দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তাদের জীবনে বরকত, রহমত ও কল্যাণ দান করেন

দরূদ শরিফ (সালাত ও সালাম) হলো রাসূল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা, সম্মান ও আনুগত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। একজন মুমিন যখন আন্তরিকতার সঙ্গে নবী ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠ করেন, তখন তিনি শুধু একটি ইবাদতই করেন না; বরং আল্লাহর রহমত, ফেরেশতাদের দোয়া এবং অসংখ্য কল্যাণ লাভের দরজাও উন্মুক্ত করেন।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

"নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর দরূদ পাঠ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তাঁর ওপর দরূদ ও সালাম পাঠ কর।"
(সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫৬)

এই আয়াত থেকেই বোঝা যায়, দরূদ পাঠ করা কোনো সাধারণ আমল নয়; বরং এটি এমন একটি ইবাদত, যার নির্দেশ স্বয়ং আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন।

দরূদ পাঠকারীর প্রতি আল্লাহর রহমত

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

"যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার ওপর দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ মাফ করবেন এবং তার দশটি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন।"

(সুনান আন-নাসায়ী, হাদিস: ১২৯৭; মুসনাদ আহমাদ)

অর্থাৎ একটি দরূদের বিনিময়েই বান্দা আল্লাহর বিশেষ রহমতের অধিকারী হয়ে যায়।

দরূদ দুশ্চিন্তা দূর করার অন্যতম আমল

উবাই ইবন কা'ব (রা.) বলেন, তিনি রাসূল ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন—আমি যদি আমার দোয়ার অধিকাংশ সময় আপনার ওপর দরূদ পাঠে ব্যয় করি? রাসূল ﷺ বলেন—

"তাহলে তোমার সব চিন্তা দূর করে দেওয়া হবে এবং তোমার গুনাহ ক্ষমা করা হবে।"

(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ২৪৫৭ — হাসান)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, দরূদ মানুষের দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও মানসিক অশান্তি দূর হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল।

দরূদ রিজিক ও জীবনে বরকতের মাধ্যম

সহিহ হাদিসে সরাসরি "দরূদ পড়লে ধনী হয়ে যাবে"—এমন কথা নেই। তবে আল্লাহর রহমত, গুনাহ মাফ, দোয়া কবুল এবং দুশ্চিন্তা দূর হওয়ার ফলে মানুষের জীবনে বরকত আসে। গুনাহ কমে, অন্তরে প্রশান্তি আসে এবং আল্লাহ কল্যাণের দরজা খুলে দেন।

তাই বলা যায়, দরূদ এমন একটি আমল যা বান্দার জীবনে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ বয়ে আনে।

রাসূল ﷺ-এর নিকটবর্তী হওয়ার উপায়

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

"কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করেছে।"

(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৪ — হাসান)

একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সুসংবাদ আর কী হতে পারে!

দরূদ দোয়া কবুলের অন্যতম কারণ

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত—

"দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না নবী ﷺ-এর ওপর দরূদ পাঠ করা হয়।"

(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৪৮৬)

এ কারণে আলেমগণ দোয়ার শুরু ও শেষে দরূদ পাঠ করতে উৎসাহিত করেছেন।

কৃপণ কে?

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

"সে-ই প্রকৃত কৃপণ, যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হলো অথচ সে আমার ওপর দরূদ পাঠ করল না।"

(জামি' আত-তিরমিযী, হাদিস: ৩৫৪৬)

অতএব, নবী ﷺ-এর নাম শুনলে সঙ্গে সঙ্গে দরূদ পাঠ করা একজন মুমিনের কর্তব্য।

দরূদ পাঠের উত্তম সময়

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের শেষ বৈঠকে।
  • দোয়ার শুরু ও শেষে।
  • জুমার দিন ও জুমার রাতে।
  • নবী ﷺ-এর নাম শুনলে।
  • সকাল-সন্ধ্যার জিকিরের সঙ্গে।

কোন দরূদটি পড়া উত্তম?

সালাতে পড়া দরূদে ইবরাহিমই সবচেয়ে উত্তম—

اللهم صل على محمد وعلى آل محمد كما صليت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنك حميد مجيد، اللهم بارك على محمد وعلى آل محمد كما باركت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنك حميد مجيد।

এছাড়া সংক্ষেপে—

অথবা

اللهم صل وسلم على نبينا محمد

পাঠ করাও সুন্নত।

জীবনে কী পরিবর্তন আসে?

যে ব্যক্তি নিয়মিত দরূদ পাঠ করে—

  • আল্লাহর রহমত লাভ করে।
  • গুনাহ মাফ হয়।
  • মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
  • দুশ্চিন্তা লাঘব হয়।
  • দোয়া কবুলের আশা বৃদ্ধি পায়।
  • অন্তরে নবী ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা জন্মায়।
  • কিয়ামতের দিন রাসূল ﷺ-এর সান্নিধ্য লাভের সুসংবাদ পায়।
  • জীবনে বরকত ও প্রশান্তি আসে, ইনশাআল্লাহ।

উপসংহার

দরূদ শরিফ এমন একটি ইবাদত, যা খুব সহজ কিন্তু এর প্রতিদান অত্যন্ত মহান। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সহিহ হাদিসে যা বলা হয়েছে, আমরা শুধু সেটিই প্রচার করব। "দরূদ পড়লে আল্লাহ জীবনকে সবকিছু দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেবেন"—এ বাক্যটি হাদিসের ভাষা নয়। কিন্তু সহিহ হাদিসে প্রমাণিত যে, দরূদ পাঠকারীর ওপর আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন, গুনাহ ক্ষমা করেন, মর্যাদা বৃদ্ধি করেন, দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণের ব্যবস্থা করেন। তাই আসুন, প্রতিদিন বেশি বেশি দরূদ পাঠের অভ্যাস গড়ে তুলি এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ভালোবাসাকে আমাদের জীবনের অংশ বানাই।

আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম 'আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ। আমীন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম