ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান একটা আয়াত ৩১ বার – আল্লাহ কেন বারবার জিজ্ঞেস করছেন?

“فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ”

উচ্চারণ: ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান
অর্থ: “অতএব, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?”

সূরা আর-রহমানের সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো—এই আয়াতটি পুরো সূরায় ৩১ বার পুনরাবৃত্ত হয়েছে। অনেকের মনে প্রশ্ন আসে, আল্লাহ কেন একই প্রশ্ন বারবার করছেন? একবার বললেই তো যথেষ্ট ছিল!

আসলে এই পুনরাবৃত্তির মধ্যেই রয়েছে গভীর সতর্কতা, কৃতজ্ঞতার শিক্ষা, আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের স্মরণ এবং মানুষের অন্তরকে জাগিয়ে তোলার এক অসাধারণ পদ্ধতি। সূরা আর-রহমানের শুরুতেই আল্লাহ বলেন, তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে বর্ণনা ও প্রকাশের ক্ষমতা দিয়েছেন। এরপর পৃথিবী, আকাশ, সূর্য-চন্দ্র, উদ্ভিদ, সমুদ্র, মুক্তা, প্রবাল, মৃত্যু, কিয়ামত, জাহান্নাম এবং জান্নাতের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামত বা সতর্কতার পর যেন প্রশ্নটি ফিরে আসে—“তাহলে তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?”

১. “আলাই” শব্দের অর্থ কী?

আয়াতটি বোঝার জন্য প্রথমে “আলাই” শব্দটির অর্থ জানা জরুরি। আরবি “آلاء” (আলাই) শব্দের অর্থ আল্লাহর নিয়ামত, অনুগ্রহ, দয়া ও ক্ষমতার নিদর্শন। তাফসিরে ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে—এখানে “আলাই” বলতে আল্লাহর নিয়ামত বোঝানো হয়েছে। মুজাহিদ ও অন্যান্য মুফাসসিরও একই অর্থের দিকে ইঙ্গিত করেছেন।

আর “রাব্বিকুমা”—অর্থাৎ “তোমাদের উভয়ের রব”। এখানে “উভয়” বলতে মানুষ ও জিন—এই দুই সৃষ্টিজগতকে বোঝানো হয়েছে। সূরার পরবর্তী আয়াতেই মানুষ ও জিনের সৃষ্টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এই প্রশ্ন শুধু মানুষের জন্য নয়; জিন জাতিও এর অন্তর্ভুক্ত।

অর্থাৎ আল্লাহ যেন মানুষ ও জিন উভয়কেই বলছেন—

“আমি তোমাদের এত কিছু দিয়েছি; বলো তো, কোন নিয়ামতকে তোমরা অস্বীকার করবে?”

২. ৩১ বার পুনরাবৃত্তির মূল উদ্দেশ্য কী?

৩১ বার পুনরাবৃত্তির ব্যাপারে কুরআন বা সহিহ হাদিসে এমন কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই যে, “৩১ সংখ্যার অমুক বিশেষ রহস্যের জন্যই আয়াতটি ৩১ বার এসেছে।”

তাই সংখ্যাটিকে কেন্দ্র করে নিশ্চিত কোনো অলৌকিক বা শরিয়ত-নির্ধারিত অর্থ দাবি করা ঠিক হবে না।

তবে সূরার বিষয়বস্তু ও মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা থেকে পুনরাবৃত্তির উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। আল্লাহ একের পর এক নিয়ামত ও নিদর্শন স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষ ও জিনকে প্রশ্ন করছেন। তাফসিরে দেখা যায়, এই আয়াতটি সূরার বিভিন্ন অংশে সৃষ্টির নিদর্শন, সতর্কতা, জাহান্নাম এবং জান্নাতের বর্ণনার পর ফিরে এসেছে।

এটি যেন একজন মমতাময় রবের পক্ষ থেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া—

“এত কিছু দেখেও কি তুমি আমাকে ভুলে যাবে?”

৩. আল্লাহ কি সত্যিই উত্তর জানতে চাইছেন?

না, মানুষের মতো তথ্য জানার জন্য আল্লাহ প্রশ্ন করছেন না। আল্লাহ সর্বজ্ঞ। তিনি জানেন মানুষ কী অস্বীকার করে এবং কী স্বীকার করে।

এখানে প্রশ্নের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায় করা এবং অন্তরকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে।

যেমন, একজন মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়—

“তোমার চোখ কে দিয়েছে?”

“তোমার কান কে দিয়েছে?”

“শ্বাস নেওয়ার ক্ষমতা কে দিয়েছে?”

“পানি কে দিয়েছে?”

“সূর্যের আলো কে দিয়েছে?”

“তোমাকে জীবন কে দিয়েছে?”

প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর যদি একই হয়—আল্লাহ, তাহলে মানুষ নিজের অজান্তেই উপলব্ধি করতে শুরু করে, সে কত অসংখ্য নিয়ামতের মধ্যে বসবাস করছে।

এটাই সূরা আর-রহমানের একটি শক্তিশালী শিক্ষাপদ্ধতি।

৪. কুরআন শেখানো—প্রথম নিয়ামত

সূরা আর-রহমানের শুরুতেই আল্লাহ বলেন—

“পরম করুণাময়, তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন।”
(সূরা আর-রহমান: ১–২)

খেয়াল করুন, আল্লাহ প্রথমেই মানুষের দৃষ্টি দুনিয়ার সম্পদ বা খাদ্যের দিকে দেননি; বরং কুরআনের শিক্ষা উল্লেখ করেছেন।

কারণ একজন মানুষের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো—সে তার রবকে চিনতে পারে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য জানতে পারে এবং সঠিক পথের সন্ধান পায়।

আমরা বাড়ি, গাড়ি, টাকা, চাকরি, ব্যবসা—এসবকে নিয়ামত মনে করি। কিন্তু হেদায়াতের নিয়ামত যে কত বড়, তা অনেক সময় ভুলে যাই।

তাই সূরা আর-রহমান যেন প্রথমেই আমাদের শেখায়—

সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু দুনিয়ার সম্পদ নয়; আল্লাহর হেদায়াতও একটি মহা নিয়ামত।

৫. মানুষকে বারবার স্মরণ করানো দরকার

মানুষের একটি স্বভাব হলো—সে খুব দ্রুত ভুলে যায়।

আজ যে মানুষ সুস্থ, সে অসুস্থতার কষ্ট ভুলে যায়।
আজ যে মানুষ খাবার পাচ্ছে, সে ক্ষুধার্ত থাকার দিন ভুলে যায়।
আজ যে মানুষ পরিবারের পাশে সবাইকে পাচ্ছে, সে একাকীত্বের কথা ভুলে যায়।

তাই আল্লাহ একই প্রশ্ন বারবার করেছেন।

একবার শুনলে হয়তো আমরা বলব, “হ্যাঁ, আল্লাহর অনেক নিয়ামত আছে।”

কিন্তু ১০ বার, ২০ বার, ৩০ বার শুনলে অন্তরকে প্রশ্নটি আরও গভীরভাবে নাড়া দেয়।

“আমি আসলে কত নিয়ামতের মধ্যে আছি!”

৬. মানুষ ও জিন—উভয়কেই প্রশ্ন

“রাব্বিকুমা” শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ শুধু মানুষকে নয়, মানুষ ও জিন—দুই জাতিকেই সম্বোধন করেছেন। তাফসিরে ইবন জারির আত-তাবারি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এখানে خطاب বা সম্বোধন মানুষ ও জিন উভয়ের দিকে ফিরে যায়।

অর্থাৎ পৃথিবীতে যত মানুষ এবং জিন আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করছে, সবাই এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—

“তোমরা তোমাদের রবের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?”

এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহর নিয়ামত ভোগ করার ক্ষেত্রে মানুষ যেমন অক্ষম, জিনও তেমনি তাঁর মুখাপেক্ষী।

৭. এই আয়াতের সবচেয়ে সুন্দর উত্তর দিয়েছিল কারা?

এখানেই আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস।

জাবির ইবন আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের সামনে সূরা আর-রহমান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করলেন। সাহাবিরা নীরব ছিলেন। তখন রাসুল ﷺ বললেন, তিনি জিনদের কাছে এই সূরা পাঠ করেছিলেন এবং তারা সাহাবিদের চেয়ে উত্তমভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।

যখনই তিনি—

“ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান”

আয়াতে পৌঁছাতেন, তারা বলত—

“হে আমাদের রব! আমরা আপনার কোনো নিয়ামতই অস্বীকার করি না; সুতরাং আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা।”

এই বর্ণনাটি জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩২৯১-এ এসেছে। তবে হাদিসটির সনদ নিয়ে মুহাদ্দিসদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে; ইমাম তিরমিজি এটিকে “গরিব” বলেছেন এবং সনদের কিছু বর্ণনাকারী সম্পর্কে সমালোচনাও উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে কিছু আলেম বিভিন্ন সনদ বিবেচনায় এটিকে হাসান বলেছেন। তাই এটিকে উল্লেখ করার সময় এই হাদিসগত অবস্থাটি মনে রাখা উচিত।

তবে বর্ণনাটির শিক্ষা অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী—

আল্লাহ যখন নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, মুমিনের উত্তর হওয়া উচিত: “হে আমাদের রব, আমরা আপনার কোনো নিয়ামত অস্বীকার করি না।”

৮. সাহাবিদের নীরবতার মধ্যেও শিক্ষা আছে

উক্ত বর্ণনায় রাসুল ﷺ সাহাবিদের নীরবতা দেখে তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তারা চুপ করে আছেন। এটি আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

কুরআন শুধু পড়ে শেষ করার বিষয় নয়। কুরআনের আয়াত শুনে প্রতিক্রিয়া দেখানো, চিন্তা করা এবং নিজের জীবনকে সংশোধন করা—এটাই আসল উদ্দেশ্য।

যখন আল্লাহ বলেন—

“আমি তোমাকে সৃষ্টি করেছি।”

আমার উত্তর কী?

“আলহামদুলিল্লাহ।”

যখন বলেন—

“আমি তোমার জন্য পৃথিবীতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছি।”

উত্তর কী?

“আলহামদুলিল্লাহ।”

যখন বলেন—

“আমি তোমাকে হেদায়াতের জন্য কুরআন দিয়েছি।”

উত্তর কী?

“আলহামদুলিল্লাহ।”

৯. শুধু সুন্দর কণ্ঠে পড়লেই হবে না

আমরা অনেক সময় সূরা আর-রহমান সুন্দর কণ্ঠে শুনি এবং মন ভালো হয়ে যায়। এটি অবশ্যই ভালো।

কিন্তু সূরার আসল উদ্দেশ্য শুধু আবেগ সৃষ্টি করা নয়।

আল্লাহ চান আমরা নিয়ামত চিনতে শিখি

চোখ আছে—কিন্তু আমরা কি শুকরিয়া আদায় করি?

কান আছে—কিন্তু কী শুনছি?

জিহ্বা আছে—কিন্তু কী বলছি?

হাত আছে—কিন্তু কী করছি?

পা আছে—কোথায় নিয়ে যাচ্ছি?

সম্পদ আছে—কোথায় ব্যয় করছি?

সময় আছে—কী কাজে ব্যয় করছি?

এগুলোও আল্লাহর নিয়ামত এবং এগুলোর ব্যাপারে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।

১০. শুধু সুখের বিষয় নয়, বিপদও এক ধরনের নিয়ামত হতে পারে

সূরা আর-রহমানে শুধু জান্নাতের কথা নেই; জাহান্নামের ভয়াবহতাও এসেছে।

এখানে একটি গভীর শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহর নিয়ামত শুধু টাকা-পয়সা, স্বাস্থ্য, খাবার ও সুখের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

কখনো বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া নিয়ামত।
কখনো কোনো গুনাহ থেকে দূরে রাখা নিয়ামত।
কখনো কোনো দুঃখ আমাদের আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনা নিয়ামত।
কখনো কোনো শাস্তি থেকে অবকাশ পাওয়াও নিয়ামত।

তাফসিরের আলোচনায় এই আয়াতের পুনরাবৃত্তিকে কখনো কখনো শাস্তি থেকে রক্ষা ও আল্লাহর অনুগ্রহের সঙ্গেও সম্পর্কিত করা হয়েছে।

তাই জীবনে কোনো কঠিন সময় এলে শুধু “কেন আমার সঙ্গে এমন হলো?” না বলে প্রশ্ন করা যায়—

“এই পরিস্থিতির মধ্যেও আল্লাহ আমাকে কোন শিক্ষা বা নিয়ামত দিচ্ছেন?”

১১. জান্নাতের বর্ণনার পরও একই প্রশ্ন কেন?

সূরা আর-রহমানে জান্নাতের সৌন্দর্য, উদ্যান, ঝরনা, ফলমূল এবং অন্যান্য পুরস্কারের বর্ণনার পর আবার আসে—

“ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান।”

অর্থাৎ জান্নাত শুধু পুরস্কার নয়; সেটিও আল্লাহর নিয়ামত।

একজন মানুষ নিজের আমল দিয়ে আল্লাহর জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করতে পারে না। আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ ছাড়া কেউ সফল হতে পারে না।

তাই জান্নাতের আশা করাও আল্লাহর নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতার একটি কারণ।

১২. ৩১ সংখ্যার ব্যাপারে সতর্কতা

ইন্টারনেটে অনেক সময় বলা হয়—৩১ বার পুনরাবৃত্তির পেছনে অমুক গাণিতিক রহস্য আছে, অমুক সংখ্যার সঙ্গে এর অমুক সম্পর্ক রয়েছে ইত্যাদি।

এসব বিষয় নিয়ে কেউ গবেষণা করতে পারেন; কিন্তু সেগুলোকে কুরআন-হাদিসের নিশ্চিত ব্যাখ্যা হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়, যদি নির্ভরযোগ্য দলিল না থাকে।

নিরাপদ ও শক্তিশালী বক্তব্য হলো—

আয়াতটি ৩১ বার এসেছে—এটি কুরআনের সুস্পষ্ট বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ৩১ সংখ্যাটির নির্দিষ্ট শরিয়তসম্মত রহস্য আল্লাহ বা তাঁর রাসুল ﷺ আমাদের জানাননি।

তাই আমরা নিশ্চিতভাবে বলব না যে “৩১-এর এই রহস্য অবশ্যই এটাই।”

বরং বলব—আয়াতের পুনরাবৃত্তি আমাদের বারবার আল্লাহর নিয়ামত স্মরণ করায় এবং কৃতজ্ঞ হতে শেখায়। সূরা আর-রহমানে এই বাক্যটি মোট ৩১টি স্থানে এসেছে।

১৩. তাহলে আমাদের উত্তর কী হওয়া উচিত?

যখন আমরা সূরা আর-রহমান পড়ব এবং এই আয়াতে পৌঁছাব, তখন অন্তর থেকে আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত।

মনে মনে বলুন—

“হে আল্লাহ, আপনার কোনো নিয়ামতই আমরা অস্বীকার করি না।”

আমাদের চোখ—আপনার নিয়ামত।
আমাদের কান—আপনার নিয়ামত।
আমাদের জীবন—আপনার নিয়ামত।
আমাদের পরিবার—আপনার নিয়ামত।
আমাদের ঈমান—আপনার সবচেয়ে বড় নিয়ামত।
কুরআন—আপনার মহান নিয়ামত।
তওবার সুযোগ—আপনার নিয়ামত।
স্বাস্থ্য—আপনার নিয়ামত।
রিজিক—আপনার নিয়ামত।
এমনকি আপনার দিকে ফিরে আসার সুযোগও—আপনার নিয়ামত।

১৪. এই আয়াত আমাদের কী পরিবর্তন করতে পারে?

এই একটি আয়াত যদি আমরা বুঝে পড়ি, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে পারে।

প্রথমত: অভিযোগ কমে শুকরিয়া বাড়বে।

দ্বিতীয়ত: ছোট ছোট নিয়ামতও মূল্যবান মনে হবে।

তৃতীয়ত: অহংকার কমবে। কারণ বুঝব—আমার যা কিছু আছে, সবই আল্লাহর দান।

চতুর্থত: গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা বাড়বে। কারণ যে ব্যক্তি নিয়ামতদাতাকে চিনে, সে তাঁর অবাধ্য হতে লজ্জা পায়।

পঞ্চমত: দুঃসময়ে ধৈর্য বাড়বে। কারণ সে জানবে—আল্লাহর সিদ্ধান্তের মধ্যেও হিকমত আছে।

১৫. সূরা আর-রহমান আমাদের একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়

আমরা প্রতিদিন কত কিছু ব্যবহার করি, অথচ সেগুলোর জন্য শুকরিয়া আদায় করি না।

সকালে ঘুম থেকে উঠে চোখ খুলতে পারা—নিয়ামত।

নিজে হাঁটতে পারা—নিয়ামত।

খাবার খেতে পারা—নিয়ামত।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারা—নিয়ামত।

আল্লাহর নাম উচ্চারণ করতে পারা—নিয়ামত।

নামাজ পড়তে পারা—নিয়ামত।

কুরআন খুলে পড়তে পারা—নিয়ামত।

তওবা করার সুযোগ পাওয়া—নিয়ামত।

আমরা যদি একদিন শুধু আমাদের জীবনের নিয়ামতগুলো লিখতে বসি, হয়তো তালিকা শেষ হবে না।

আর তখন সূরা আর-রহমানের প্রশ্নটি আরও গভীর হয়ে আমাদের সামনে ফিরে আসবে—

“ফাবিআইয়্যি আলাই রাব্বিকুমা তুকাযযিবান?”

“তোমরা তোমাদের রবের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?”

উপসংহার

সূরা আর-রহমানে একই আয়াত ৩১ বার পুনরাবৃত্তি কোনো অর্থহীন পুনরাবৃত্তি নয়। এটি কুরআনের এক অসাধারণ বাগ্মিতাময় পদ্ধতি—আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামত, ক্ষমতা, সৃষ্টি, সতর্কতা ও আখিরাতের পুরস্কার স্মরণ করিয়ে দিয়ে মানুষ ও জিনকে বারবার নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে বাধ্য করা।

আল্লাহ যেন আমাদের এমন বানান, যারা শুধু সূরা আর-রহমানের এই আয়াত পড়বে না; বরং এর প্রশ্নের উত্তর নিজেদের জীবন দিয়ে দেবে।

আমরা যেন বলতে পারি—

“হে আমাদের রব! আপনার কোনো নিয়ামতই আমরা অস্বীকার করি না। আপনারই জন্য সমস্ত প্রশংসা।”

কারণ সত্যিই—

আমাদের জীবন তাঁর দান।
আমাদের ঈমান তাঁর দান।
আমাদের রিজিক তাঁর দান।
আমাদের পরিবার তাঁর দান।
আমাদের সুস্থতা তাঁর দান।
আমাদের তওবার সুযোগ তাঁর দান।
আর জান্নাতের আশাও তাঁরই দয়া।

তাই পরেরবার সূরা আর-রহমান পড়ার সময় যখন আবার শুনবেন—

“فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ”

তখন শুধু তিলাওয়াত করে সামনে এগিয়ে যাবেন না। এক মুহূর্ত থামুন। নিজের জীবনকে দেখুন। নিজের চারপাশের নিয়ামতগুলো মনে করুন। তারপর অন্তর থেকে বলুন—

“লা বি-শাইইন মিন নি‘আমিকা রাব্বানা নুকাযযিবু—হে আমাদের রব, আপনার কোনো নিয়ামতই আমরা অস্বীকার করি না। আলহামদুলিল্লাহ।”

আর এটাই হতে পারে ৩১ বার ফিরে আসা সেই প্রশ্নের সবচেয়ে সুন্দর উত্তর।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম