বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
জান্নাত—মুমিনের চূড়ান্ত স্বপ্ন। সেখানে নেই কোনো দুঃখ, ভয়, রোগ, বার্ধক্য কিংবা মৃত্যু। আল্লাহ বলেন—
“যে ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সে-ই সফল।”
—সূরা আলে ইমরান, ৩:১৮৫
অনেক সময় আমরা মনে করি, জান্নাতের জন্য হয়তো খুব বড় বড় আমল প্রয়োজন। অথচ রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের এমন অনেক ছোট কিন্তু অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল শিখিয়েছেন, যেগুলো দৈনন্দিন জীবনে সহজেই করা যায়।
নিচে এমন ৭০টি আমল দেওয়া হলো।
🕌 ১. আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখা
সব আমলের ভিত্তি হলো ঈমান। আল্লাহ ও তাঁর রাসুল ﷺ-এর প্রতি সত্য বিশ্বাস ছাড়া কোনো আমলই পূর্ণতা পায় না।
আল্লাহ বলেন—
“যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতসমূহ...”
—সূরা আল-বাকারা, ২:৮২
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা
সালাত ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এমন যে এগুলো বান্দার গুনাহ মুছে দেয়, যেমন কারও দরজার সামনে নদী থাকলে সে দিনে পাঁচবার গোসল করলে শরীরে ময়লা থাকে না।
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
৩. সালাত সময়মতো আদায় করা
আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমলগুলোর একটি হলো সময়মতো সালাত আদায় করা।
ইবনু মাসউদ (রা.) জিজ্ঞেস করলে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন—
“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সময়মতো সালাত আদায় করা।”
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
৪. জামাতে সালাত আদায় করা
পুরুষদের জন্য জামাতে সালাতের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। রাসুল ﷺ বলেছেন—
“জামাতের সালাত একাকী সালাতের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি মর্যাদাপূর্ণ।”
সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম
৫. মনোযোগসহ সালাত আদায় করা
খুশু-খুযুর সঙ্গে সালাত আদায় করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই মুমিনরা সফল হয়েছে—যারা তাদের সালাতে বিনয়ী।”
সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১-২
৬. নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা
কুরআনের প্রতিটি অক্ষর তিলাওয়াতেও সওয়াব রয়েছে।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পড়বে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে; আর প্রতিটি নেকি দশগুণ করা হয়।”
জামে আত-তিরমিজি, ২৯১০
৭. কুরআন শেখা ও শেখানো
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যে কুরআন শেখে এবং শিক্ষা দেয়।”
সহিহ বুখারি, ৫০২৭
৮. আয়াতুল কুরসি পড়া
বিশেষ করে ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পড়ার ব্যাপারে একটি প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে—
“যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা নেই।”
সুনান আন-নাসাঈ আল-কুবরা, ৯৮৪৮; হাদিসটির সনদ নিয়ে আলেমদের মধ্যে আলোচনা আছে।
তাই এটিকে সহিহ বুখারি-মুসলিমের হাদিস হিসেবে প্রচার না করে, হাদিসটির মান উল্লেখ করে আমল করা উচিত।
৯. সকাল-সন্ধ্যার যিকির করা
সকাল-সন্ধ্যায় মাসনুন যিকির মুমিনকে আল্লাহর স্মরণে রাখে এবং বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে আশ্রয় নেওয়ার মাধ্যম।
কুরআনে বলা হয়েছে—
“তোমরা সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।”
সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৪১-৪২
১০. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
“আস্তাগফিরুল্লাহ”—অত্যন্ত ছোট একটি আমল।
নবী ﷺ নিজে দিনে ১০০ বার আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন।
সহিহ মুসলিম, ২৭০২
১১. “সুবহানাল্লাহ” বলা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি দিনে ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ বলে, তার গুনাহসমূহ মুছে দেওয়া হয়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনার মতো হয়।”
সহিহ বুখারি, ৬৪০৫; সহিহ মুসলিম, ২৬৯১
১২. “আলহামদুলিল্লাহ” বলা
আল্লাহর প্রশংসা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ যিকির।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আলহামদুলিল্লাহ মিজানকে পূর্ণ করে।”
সহিহ মুসলিম, ২২৩
১৩. “আল্লাহু আকবার” বলা
“আল্লাহু আকবার”—আল্লাহর মহত্ব ঘোষণা করা।
যিকিরের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজের অন্তরকে জীবিত রাখে।
১৪. “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলা
তাওহিদের এই বাক্য ইসলামের মূল ঘোষণা।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আন্তরিকতার সঙ্গে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে এবং সে অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
সহিহ বুখারি, ১২৮; সহিহ মুসলিম, ৩২
১৫. “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আজিম” বলা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“দুটি বাক্য জিহ্বায় হালকা, মিজানে ভারী এবং রহমানের কাছে প্রিয়।”
সহিহ বুখারি, ৬৪০৬; সহিহ মুসলিম, ২৬৯৪
১৬. দরুদ শরিফ পাঠ করা
নবী ﷺ-এর ওপর সালাত ও সালাম পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন।”
সহিহ মুসলিম, ৪০৮
১৭. রাসুল ﷺ-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা
আল্লাহ বলেন—
“তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমাকে অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”
সূরা আলে ইমরান, ৩:৩১
১৮. সালামের প্রচলন করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না... তোমাদের মধ্যে সালাম প্রচলিত করো।”
সহিহ মুসলিম, ৫৪
১৯. হাসিমুখে কথা বলা
অন্য মুসলিম ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাও সদকা।
জামে আত-তিরমিজি, ১৯৫৬
২০. উত্তম কথা বলা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।”
সহিহ বুখারি, ৬০১৮; সহিহ মুসলিম, ৪৭
২১. গীবত থেকে বেঁচে থাকা
আল্লাহ বলেন—
“তোমরা একে অন্যের গীবত করো না।”
সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:১২
গীবত ছোট মনে হলেও এটি মানুষের আমল নষ্ট করার বড় কারণ হতে পারে।
২২. মিথ্যা পরিত্যাগ করা
রাসুল ﷺ মিথ্যাকে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সহিহ বুখারি, ৩৩; সহিহ মুসলিম, ৫৯
২৩. ওয়াদা পূরণ করা
আল্লাহ বলেন—
“তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৪
২৪. আমানত রক্ষা করা
আমানতদারি মুমিনের অন্যতম গুণ।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন আমানতসমূহ তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।”
সূরা আন-নিসা, ৪:৫৮
২৫. পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করা
আল্লাহ তাঁর ইবাদতের নির্দেশের পরই পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন।
সূরা আল-ইসরা, ১৭:২৩
রাসুল ﷺ পিতা-মাতার সন্তুষ্টিকে জান্নাত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে শিক্ষা দিয়েছেন।
২৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং আয়ুতে বরকত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।”
সহিহ বুখারি, ৫৯৮৬; সহিহ মুসলিম, ২৫৫৭
২৭. প্রতিবেশীর হক আদায় করা
জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিয়েছেন যে রাসুল ﷺ মনে করেছিলেন, হয়তো প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারী করে দেওয়া হবে।
সহিহ বুখারি, ৬০১৪; সহিহ মুসলিম, ২৬২৪
২৮. ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“হে মানুষ! সালাম প্রচার করো, খাবার খাওয়াও... তাহলে তোমরা শান্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
জামে আত-তিরমিজি, ২৪৮৫
২৯. পান করানোর সওয়াব অর্জন করা
তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি পান করানো বড় সওয়াবের কাজ।
এক ব্যক্তির কুকুরকে পানি পান করানোর কারণে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেছিলেন।
সহিহ বুখারি, ৩৩২১; সহিহ মুসলিম, ২২৪৪
৩০. সদকা করা
সদকা গুনাহ মুছে দেয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“সদকা গুনাহকে এমনভাবে নিভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।”
জামে আত-তিরমিজি, ৬১৪
৩১. সামান্য সদকাকেও তুচ্ছ না করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“জাহান্নাম থেকে বাঁচো, যদিও অর্ধেক খেজুর সদকা করার মাধ্যমে হয়।”
সহিহ বুখারি, ১৪১৭; সহিহ মুসলিম, ১০১৬
৩২. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে... এর সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো।”
সহিহ মুসলিম, ৩৫
৩৩. রোগী দেখতে যাওয়া
রোগী দেখতে যাওয়া মুসলিমের গুরুত্বপূর্ণ অধিকার।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“মুসলিমের ওপর মুসলিমের পাঁচটি অধিকার রয়েছে... রোগী দেখতে যাওয়া...”
সহিহ বুখারি, ১২৪০; সহিহ মুসলিম, ২১৬২
৩৪. জানাজায় অংশ নেওয়া
জানাজায় অংশ নেওয়া বড় সওয়াবের আমল।
রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি জানাজায় উপস্থিত হয়ে সালাত আদায় করে সে এক কিরাত এবং দাফন পর্যন্ত থাকলে দুই কিরাত সওয়াব পায়।
সহিহ বুখারি, ১৩২৫; সহিহ মুসলিম, ৯৪৫
৩৫. এতিমের দায়িত্ব নেওয়া
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আমি এবং এতিমের দায়িত্ব গ্রহণকারী জান্নাতে এভাবে থাকব।”
তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙুল পাশাপাশি দেখিয়েছেন।
সহিহ বুখারি, ৫৩০৪
৩৬. বিধবা ও অসহায় মানুষের সাহায্য করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“বিধবা ও দরিদ্রের জন্য চেষ্টা করা ব্যক্তি আল্লাহর পথে মুজাহিদের মতো।”
সহিহ বুখারি, ৫৩৫৩; সহিহ মুসলিম, ২৯৮২
৩৭. ঋণগ্রস্তকে সময় দেওয়া
কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি সমস্যায় থাকলে তাকে সময় দেওয়া বা ঋণের কিছু অংশ মাফ করে দেওয়া বড় নেক আমল।
সহিহ মুসলিম, ১৫৬৩
৩৮. মানুষের ভুল ক্ষমা করা
আল্লাহ বলেন—
“তারা যেন ক্ষমা করে ও উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?”
সূরা আন-নূর, ২৪:২২
৩৯. রাগ নিয়ন্ত্রণ করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“শক্তিশালী সে নয় যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।”
সহিহ বুখারি, ৬১১৪; সহিহ মুসলিম, ২৬০৯
৪০. রাগের সময় “আউযুবিল্লাহ” পড়া
রাগের সময় শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া সুন্নাহ।
সহিহ বুখারি, ৬১১৫
৪১. অযথা বিতর্ক পরিত্যাগ করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আমি জান্নাতের প্রান্তে এমন ব্যক্তির জন্য একটি ঘরের জামিন, যে সত্যের ওপর থেকেও বিতর্ক পরিত্যাগ করে।”
সুনান আবু দাউদ, ৪৮০০
৪২. অহংকার পরিত্যাগ করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।”
সহিহ মুসলিম, ৯১
৪৩. হিংসা থেকে বেঁচে থাকা
মুমিন অন্যের নেয়ামত দেখে আল্লাহর কাছে বরকত কামনা করবে, হিংসা করবে না।
হিংসা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করে এবং ভ্রাতৃত্ব নষ্ট করে।
৪৪. ভালো কাজে উৎসাহ দেওয়া
আল্লাহ বলেন—
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে।”
সূরা আলে ইমরান, ৩:১০৪
৪৫. মন্দ কাজে বাধা দেওয়া
সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যায় থেকে মানুষকে বিরত রাখা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সহিহ মুসলিম, ৪৯
৪৬. আল্লাহকে একান্তে স্মরণ করা
যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য নয়, একান্তে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তাঁর ভয়ে চোখে পানি আসে—তার জন্য বিশেষ মর্যাদা রয়েছে।
সহিহ বুখারি, ৬৬০; সহিহ মুসলিম, ১০৩১
৪৭. তাহাজ্জুদ পড়া
রাতের নামাজ নেককারদের বৈশিষ্ট্য।
আল্লাহ বলেন—
“তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় কাটাত।”
সূরা আয-যারিয়াত, ৫১:১৭
৪৮. বিতর সালাত আদায় করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“হে কুরআনের অনুসারীরা! তোমরা বিতর আদায় করো।”
সুনান আবু দাউদ, ১৪১৬; জামে আত-তিরমিজি, ৪৫৩
৪৯. ফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নাহ
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“ফজরের দুই রাকাত সুন্নাহ দুনিয়া ও তার মধ্যকার সবকিছুর চেয়ে উত্তম।”
সহিহ মুসলিম, ৭২৫
৫০. সালাতের পর যিকির করা
ফরজ সালাতের পর তাসবিহ, তাহমিদ ও তাকবির পাঠ করা সুন্নাহ।
সহিহ বুখারি, ৮৪৩; সহিহ মুসলিম, ৫৯৫
৫১. ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি পড়া
সহিহ বুখারির একটি দীর্ঘ হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.)-এর ঘটনা এসেছে, যেখানে শয়তান আয়াতুল কুরসি পড়লে রাতভর আল্লাহর পক্ষ থেকে হেফাজতের কথা উল্লেখ করে।
রাসুল ﷺ পরে বলেন—
“সে তোমাকে সত্য বলেছে, যদিও সে মিথ্যাবাদী।”
সহিহ বুখারি, ২৩১১
৫২. ঘুমের আগে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া
রাসুল ﷺ রাতে এই তিন সূরা পড়ে হাতে ফুঁ দিয়ে শরীরে মুছে নিতেন।
সহিহ বুখারি, ৫০১৭
৫৩. ঘুমের আগে তাসবিহ পাঠ করা
আলী (রা.) ও ফাতিমা (রা.)-কে রাসুল ﷺ ঘুমের আগে ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪ বার আল্লাহু আকবার পড়তে শিক্ষা দিয়েছিলেন।
সহিহ বুখারি, ৩৭০৫; সহিহ মুসলিম, ২৭২৭
৫৪. খাওয়ার আগে “বিসমিল্লাহ” বলা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, সে যেন আল্লাহর নাম নেয়।”
সুনান আবু দাউদ, ৩৭৬৭; জামে আত-তিরমিজি, ১৮৫৯
৫৫. খাওয়ার পর আল্লাহর প্রশংসা করা
খাওয়ার পর “আলহামদুলিল্লাহ” বলা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার প্রকাশ।
রাসুল ﷺ খাবারের পর আল্লাহর প্রশংসা করলে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন—এ মর্মে হাদিস রয়েছে।
সহিহ মুসলিম, ২৭৩৪
৫৬. ডান হাতে খাওয়া
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের কেউ যেন ডান হাতে খায়, ডান হাতে পান করে।”
সহিহ মুসলিম, ২০২০
৫৭. খাবারের পাত্রে পড়ে থাকা খাবার অপচয় না করা
রাসুল ﷺ খাবার অপচয় না করতে এবং খাবারের অবশিষ্টাংশ থেকেও বরকত অনুসন্ধান করতে শিক্ষা দিয়েছেন।
সহিহ মুসলিম, ২০৩৩
৫৮. মসজিদে যাওয়া
মসজিদের দিকে প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য নেকি লেখা এবং গুনাহ মোচন হওয়ার কথা হাদিসে এসেছে।
সহিহ বুখারি, ২৮২৭; সহিহ মুসলিম, ৬৬৯
৫৯. মসজিদে অপেক্ষা করা
যতক্ষণ ব্যক্তি সালাতের অপেক্ষায় থাকে, ফেরেশতারা তার জন্য দোয়া করতে থাকেন।
সহিহ বুখারি, ৬৫৯; সহিহ মুসলিম, ৬৪৯
৬০. অযু সুন্দরভাবে করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অযু করে, তার গুনাহসমূহ তার শরীর থেকে বের হয়ে যায়।”
সহিহ মুসলিম, ২৪৪
৬১. অযুর পর শাহাদাত পাঠ করা
রাসুল ﷺ বলেছেন, যে ব্যক্তি সুন্দরভাবে অযু করে তারপর শাহাদাত পাঠ করে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হয়।
সহিহ মুসলিম, ২৩৪
৬২. অযুর পর দুই রাকাত সালাত
বিলাল (রা.)-এর ব্যাপারে রাসুল ﷺ তাঁর জান্নাতে পদশব্দ শোনার কথা বলেছেন। বিলাল (রা.) নিয়মিত অযুর পর সালাত আদায় করতেন।
সহিহ বুখারি, ১১৪৯; সহিহ মুসলিম, ২৪৫৮
৬৩. সিয়াম পালন করা
রমজানের রোজা ইসলামের ফরজ ইবাদত।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে এবং সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
সহিহ বুখারি, ৩৮; সহিহ মুসলিম, ৭৬০
৬৪. নফল রোজা রাখা
সামর্থ্য অনুযায়ী সোমবার-বৃহস্পতিবার কিংবা আইয়ামে বীজের মতো সুন্নাহ রোজা রাখা নেক আমল।
সোমবার ও বৃহস্পতিবার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়—এ মর্মে হাদিস রয়েছে।
জামে আত-তিরমিজি, ৭৪৭
৬৫. আরাফার দিনের রোজা
অ-হাজিদের জন্য আরাফার দিনের রোজার বিশেষ ফজিলত রয়েছে।
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আরাফার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছর ও পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা হওয়ার আশা করা যায়।”
সহিহ মুসলিম, ১১৬২
৬৬. আশুরার রোজা
মুহাররমের ১০ তারিখের রোজার ব্যাপারে রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আশা করি আল্লাহ এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করবেন।”
সহিহ মুসলিম, ১১৬২
৬৭. কবর জিয়ারত করে আখিরাত স্মরণ করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আমি তোমাদের কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম; এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো, কারণ তা আখিরাত স্মরণ করিয়ে দেয়।”
সহিহ মুসলিম, ৯৭৭
৬৮. মৃত্যু বেশি বেশি স্মরণ করা
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তোমরা আনন্দ বিনষ্টকারী বিষয়—মৃত্যুকে—বেশি বেশি স্মরণ করো।”
জামে আত-তিরমিজি, ২৩০৭
মৃত্যুর স্মরণ মানুষকে গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করে।
৬৯. আল্লাহর কাছে জান্নাত চাওয়া
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে জান্নাত চায়, জান্নাত তার জন্য আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা করে।”
এ মর্মে হাদিসে জান্নাত ও জাহান্নামের দোয়ার গুরুত্ব এসেছে।
জামে আত-তিরমিজি, ২৫৭২
তাই নিয়মিত বলুন—
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ
“হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত প্রার্থনা করছি।”
🌿 ৭০. রাসুল ﷺ-এর কাছে জান্নাতে সঙ্গী হওয়ার দোয়া করা
উম্মে হারিসা (রা.)-এর ঘটনায় রাসুল ﷺ বলেছেন—
“তুমি যাকে ভালোবাসো, তার সঙ্গেই থাকবে।”
সহিহ বুখারি, ৬১৬৯; সহিহ মুসলিম, ২৬৩৯
তাই আল্লাহর কাছে জান্নাতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সঙ্গ চাওয়া এবং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা একজন মুমিনের বড় আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত।
❤️ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
এই ৭০টি আমলের মধ্যে কিছু ফরজ, কিছু সুন্নাহ, কিছু নফল এবং কিছু সাধারণ নেক কাজ। তাই এগুলোকে একই স্তরের আমল মনে করা যাবে না।
একজন মুসলিমের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—
১. ঈমান ঠিক করা
২. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ঠিক করা
৩. রমজানের রোজা ও অন্যান্য ফরজ আদায় করা
৪. হারাম থেকে বেঁচে থাকা
৫. পিতা-মাতার হক আদায় করা
৬. মানুষের হক নষ্ট না করা
৭. এরপর নফল ও অতিরিক্ত আমল বাড়ানো।
কারণ রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ বলেন—
“আমার বান্দা আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় যে কাজের মাধ্যমে আমার নৈকট্য লাভ করে, তা হলো আমি তার ওপর যা ফরজ করেছি।”
এরপর নফল আমল করতে করতে বান্দা আল্লাহর আরও নৈকট্য লাভ করতে থাকে।
সহিহ বুখারি, ৬৫০২
🌸 জান্নাতের জন্য ছোট্ট দৈনিক রুটিন
প্রতিদিন চেষ্টা করতে পারেন—
✅ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত
✅ কিছু কুরআন তিলাওয়াত
✅ ১০০ বার ইস্তিগফার
✅ নিয়মিত দরুদ
✅ “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি”
✅ সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন যিকির
✅ পিতা-মাতার সঙ্গে ভালো আচরণ
✅ অন্তত একটি সদকা/ভালো কাজ
✅ কারও মনে কষ্ট না দেওয়া
✅ গীবত-মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা
✅ ঘুমের আগে আয়াতুল কুরসি ও তিন কুল
✅ নিজের ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া
✅ আল্লাহর কাছে জান্নাত চাওয়া
মনে রাখবেন, আমলের সংখ্যা নয়—ইখলাস, সুন্নাহ অনুযায়ী আমল, ফরজ পালন এবং ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল্লাহ বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।”
—সূরা আত-তাওবা, ৯:১২০
আল্লাহ আমাদের ঈমানের সঙ্গে জীবন কাটানোর, ছোট-বড় সব নেক আমল করার এবং তাঁর রহমতে জান্নাতুল ফিরদাউস লাভ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
