আল্লাহ যাকে খুশি করতে চান, তাকে ছেলে সন্তান দেন! আর আল্লাহ যার উপর খুশি হয়ে যান, তাকে কন্যা সন্তান দেন!

সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহামূল্যবান নেয়ামত ও আমানত। ছেলে হোক কিংবা মেয়ে—প্রত্যেক সন্তানই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর ইচ্ছা ও হিকমতের অধীন। তবে সমাজে একটি কথা প্রচলিত আছে—“আল্লাহ যাকে খুশি করতে চান, তাকে ছেলে সন্তান দেন; আর আল্লাহ যার ওপর খুশি হয়ে যান, তাকে কন্যা সন্তান দেন।” কথাটি শুনতে সুন্দর ও আবেগপূর্ণ হলেও এর অর্থকে সরাসরি কুরআন বা সহিহ হাদিসের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা ঠিক নয়।

ইসলাম বরং আমাদের শেখায়—ছেলে ও মেয়ে উভয় সন্তানই আল্লাহর দান, আর কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা, লালন-পালন ও উত্তমভাবে মানুষ করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল।

সন্তান ছেলে না মেয়ে—সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহর

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:

“আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রাজত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করেন।”

সূরা আশ-শূরা, ৪২:৪৯–৫০

এই আয়াত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে—এটি মানুষের হাতে নয়; আল্লাহর সিদ্ধান্তেই তা নির্ধারিত হয়।

কেউ শুধু ছেলে সন্তান পেলে আল্লাহ তার ওপর বেশি সন্তুষ্ট—এমন কথা কুরআন বলেনি। আবার কেউ কন্যাসন্তান পেলে আল্লাহ তার ওপর বিশেষভাবে খুশি—এমন কথাও এই আয়াতে বলা হয়নি।

তবে কন্যাসন্তানের মর্যাদা সম্পর্কে ইসলাম যে অসাধারণ শিক্ষা দিয়েছে, তা হাদিসে অত্যন্ত সুন্দরভাবে এসেছে।

কন্যাসন্তানকে বোঝা মনে করা জাহেলিয়াতের চিন্তা

ইসলাম আসার আগে আরব সমাজের কিছু মানুষ কন্যাসন্তান জন্মকে অপমান ও দুর্ভাগ্য মনে করত। এমনকি কেউ কেউ কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দিত।

কুরআন এই নির্মম প্রথার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। আল্লাহ বলেন:

“যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাশিশুকে জিজ্ঞেস করা হবে—কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”

সূরা আত-তাকভীর, ৮১:৮–৯

অর্থাৎ একটি কন্যাশিশু জন্মেছে—এটাই কোনো অপরাধ নয়। বরং তার ওপর অন্যায় করা ভয়াবহ অপরাধ।

আজও যদি কেউ মনে করেন, “মেয়ে হয়েছে, তাই আমি দুর্ভাগা”—তাহলে তাকে ইসলামের এই শিক্ষা মনে রাখা উচিত। কন্যা সন্তান কোনো অভিশাপ নয়; সে আল্লাহর আমানত।

কন্যাসন্তান লালন-পালনের বিশেষ ফজিলত

রাসুলুল্লাহ ﷺ কন্যাসন্তানদের উত্তমভাবে লালন-পালন করার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছেন।

হযরত আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, এক নারী তার দুই কন্যাকে নিয়ে সাহায্য চাইতে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে এসেছিলেন। তার কাছে দেওয়ার মতো মাত্র একটি খেজুর ছিল। তিনি সেটি দুই কন্যার মধ্যে ভাগ করে দিলেন এবং নিজে কিছু খেলেন না।

এই ঘটনা দেখে রাসুলুল্লাহ ﷺ কন্যাদের প্রতি তার মমতা ও যত্নের প্রশংসা করেন এবং জানান যে, তাদের কারণে তার জন্য আগুন থেকে রক্ষার ব্যবস্থা হতে পারে।

সহিহ বুখারি, হাদিস ১৪১৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬২৯

এখানে আমাদের জন্য বড় শিক্ষা রয়েছে। কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা, তার প্রয়োজন পূরণ করা, তাকে নিরাপদ রাখা এবং উত্তমভাবে মানুষ করা—এসব কাজ আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান হতে পারে।

দুই কন্যাকে লালন-পালনের ব্যাপারে সুসংবাদ

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“যে ব্যক্তি দুই কন্যাকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করবে, কিয়ামতের দিন সে এবং আমি এভাবে থাকব।”

এ কথা বলে তিনি তাঁর দুই আঙুল পাশাপাশি করেছেন।

সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৩১

ভাবুন, একজন বাবা-মা তাদের দুই মেয়েকে ভালোভাবে মানুষ করার কারণে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর এত নিকটবর্তী হওয়ার সুসংবাদ পাচ্ছেন!

এ কারণেই কন্যাসন্তানকে অবহেলা করা ইসলামের শিক্ষা নয়। বরং তাকে ঈমান, আদব, শিক্ষা ও উত্তম চরিত্রে গড়ে তোলা একটি বড় নেক কাজ।

তিন কন্যার ব্যাপারেও রয়েছে সুসংবাদ

আরেক হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি তিন কন্যার দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের প্রতি সদয় হয়, তাদের প্রয়োজন পূরণ করে এবং তাদের উত্তমভাবে লালন-পালন করে, তার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে।

সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, যদি কারও দুই কন্যা হয়? রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছিলেন—দুই কন্যার ক্ষেত্রেও একই মর্যাদা রয়েছে।

জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ১৯১৬

অন্য বর্ণনায় এক কন্যার ব্যাপারেও মহান সওয়াবের কথা এসেছে।

অর্থাৎ ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানের সংখ্যা নয়, তাদের প্রতি দায়িত্ব ও উত্তম আচরণ গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে কি কন্যাসন্তান পাওয়া আল্লাহর বিশেষ সন্তুষ্টির প্রমাণ?

এখানে একটি বিষয় খুব সতর্কতার সঙ্গে বুঝতে হবে।

কন্যাসন্তান পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় নেয়ামত। কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা ও উত্তমভাবে লালন-পালনের বিশেষ ফজিলতও সহিহ হাদিসে রয়েছে। কিন্তু “যার ওপর আল্লাহ খুশি, তাকেই কন্যাসন্তান দেন”—এটিকে সহিহ হাদিসের সরাসরি বক্তব্য বলা যাবে না।

কারণ আল্লাহ কখনো কাউকে ছেলে দেন, কখনো মেয়ে দেন, কখনো উভয়ই দেন এবং কখনো সন্তান দেন না। প্রত্যেক অবস্থার মধ্যেই তাঁর হিকমত রয়েছে।

কেউ ছেলে সন্তান পেয়েছেন—এটি আল্লাহর নেয়ামত।

কেউ কন্যাসন্তান পেয়েছেন—এটিও আল্লাহর নেয়ামত।

কেউ ছেলে-মেয়ে উভয়ই পেয়েছেন—এটিও আল্লাহর বিশেষ দান।

আবার কেউ সন্তানহীন—তাঁর অবস্থাও আল্লাহর জ্ঞান ও হিকমতের বাইরে নয়।

তাই সন্তানের লিঙ্গকে আল্লাহর সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির নিশ্চিত মাপকাঠি বানানো ঠিক নয়।

ছেলে সন্তান কি কম নেয়ামত?

কখনোই নয়।

কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তিনি যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দেন এবং যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দেন। তাই ছেলে সন্তানও আল্লাহর পক্ষ থেকে মূল্যবান নেয়ামত।

একজন বাবা যদি ছেলে পেয়ে আনন্দ করেন, তাতে সমস্যা নেই। কিন্তু সেই আনন্দ যেন কন্যাসন্তানকে ছোট করার কারণ না হয়।

একজন মা-বাবার উচিত বলা:

“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমাদের একটি সন্তান দিয়েছেন।”

কারণ সন্তান ছেলে না মেয়ে—তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে যেন একজন নেককার বান্দা/বান্দি হিসেবে বড় হয়।

কন্যাসন্তানকে অবহেলা করা বড় অন্যায়

অনেক পরিবারে এখনো ছেলে সন্তান জন্মালে আনন্দ বেশি হয়, কিন্তু মেয়ে হলে মুখ ভার হয়ে যায়। ইসলাম এই মানসিকতা সমর্থন করে না।

আল্লাহ বলেন:

“যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়।”

সূরা আন-নাহল, ১৬:৫৮

এরপর আল্লাহ জাহেলিয়াতের এই মানসিকতার কঠোর সমালোচনা করেছেন।

অতএব, কন্যাসন্তান জন্মের পর হতাশ হওয়া, স্ত্রীকে দোষ দেওয়া কিংবা তাকে বোঝা মনে করা ইসলামের শিক্ষা নয়।

সন্তান আল্লাহর আমানত

সন্তান আমাদের সম্পত্তি নয়। তারা আল্লাহর আমানত।

বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো তাদের—

  • ঈমান ও আকিদা শেখানো,
  • নামাজের শিক্ষা দেওয়া,
  • হালাল-হারাম সম্পর্কে সচেতন করা,
  • উত্তম চরিত্র গড়ে তোলা,
  • ভালোবাসা ও নিরাপত্তা দেওয়া,
  • প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া,
  • অন্যায় ও নির্যাতন থেকে রক্ষা করা।

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

“তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯

তাই সন্তান ছেলে কিংবা মেয়ে—উভয়ের ব্যাপারেই বাবা-মাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।

কন্যাসন্তান আপনার জন্য জান্নাতের দরজা হতে পারে

একজন কন্যা জন্ম নেওয়ার পর যদি বাবা-মা তাকে অবহেলা না করে বরং ভালোবাসা দিয়ে বড় করেন, তার শিক্ষা ও চরিত্রের যত্ন নেন এবং তাকে ইসলামের আদর্শে গড়ে তোলেন, তাহলে সেই সন্তান তাদের জন্য দুনিয়ার আনন্দের পাশাপাশি আখিরাতের নাজাতের কারণ হতে পারে।

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিসগুলো আমাদের এই আশাই দেয়।

তাই কন্যাসন্তান জন্মের সময় কারও বলা উচিত নয়—

“আহা, ছেলে হলে ভালো হতো!”

বরং বলা উচিত—

“আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমাদের একটি আমানত দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে নেককার বানান।”

সবচেয়ে সুন্দর শিক্ষা

আসল বিষয় হলো—আল্লাহ কার ওপর খুশি, তা শুধু ছেলে বা মেয়ে সন্তান পাওয়ার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় না।

আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথ হলো ঈমান, তাকওয়া, আনুগত্য, নেক আমল, মানুষের হক আদায় এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা।

কন্যাসন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন একটি নেয়ামত হতে পারে, যার মাধ্যমে বাবা-মা জান্নাতের পথ খুঁজে পান। একইভাবে ছেলে সন্তানও নেককার হলে বাবা-মায়ের জন্য সদকায়ে জারিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের কারণ হতে পারে।

সুতরাং প্রচলিত কথাটিকে হাদিস হিসেবে প্রচার না করে আমরা এভাবে বলতে পারি:

“ছেলে ও মেয়ে—উভয় সন্তানই আল্লাহর দান। তবে কন্যাসন্তানকে ভালোবাসা, সম্মান ও উত্তমভাবে লালন-পালনের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ ﷺ বিশেষ ফজিলতের সুসংবাদ দিয়েছেন।”

শেষ কথা

আপনার ঘরে যদি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, তাকে নিয়ে কখনো আফসোস করবেন না। সে আপনার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি আমানত, নেয়ামত ও পরীক্ষার সুযোগ

আর যদি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়, তাকেও আল্লাহর বিশেষ দান হিসেবে গ্রহণ করুন।

সন্তান ছেলে না মেয়ে—এটি নয়; বরং সে কতটা নেককার মানুষ হয়ে উঠল—সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেককার বানান, তাদের ঈমান ও চরিত্র সুন্দর করুন এবং তাদের মাধ্যমে আমাদের দুনিয়া ও আখিরাতকে কল্যাণময় করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: কুরআন—সূরা আশ-শূরা ৪২:৪৯–৫০, সূরা আন-নাহল ১৬:৫৮–৫৯, সূরা আত-তাকভীর ৮১:৮–৯; সহিহ বুখারি ৮৯৩, ১৪১৮; সহিহ মুসলিম ১৮২৯, ২৬২৯, ২৬৩১; জামে আত-তিরমিজি ১৯১৬।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম