দরুদ পাঠ একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত। বিশেষ করে নামাজের শেষ বৈঠকে পাঠ করা দরুদে ইব্রাহীম রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবায়ে কেরামকে শিক্ষা দিয়েছেন। অনেকেই মনে করেন, দিনে বেশি বেশি দরুদ পড়তে হলে দীর্ঘ সময় আলাদা করে বসতে হবে। বাস্তবে একটু পরিকল্পনা করলে দৈনন্দিন কাজের মধ্যেও অনেকবার দরুদে ইব্রাহীম পাঠ করা সম্ভব।
তবে শুরুতেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—দরুদে ইব্রাহীম নির্দিষ্ট সংখ্যক বার পড়লে অমুক ফল নিশ্চিত হবে—এমন দাবি করার জন্য সহিহ দলিল প্রয়োজন। তাই আমরা সহিহ হাদিসে প্রমাণিত ফজিলত অনুসরণ করব এবং নির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বাড়াবাড়ি করব না।
দরুদে ইব্রাহীম কী?
দরুদে ইব্রাহীমের প্রসিদ্ধ রূপ হলো—
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ، كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ।
অর্থ: “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেমন আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত। হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মদ ﷺ ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর বরকত দান করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি প্রশংসিত, মহিমান্বিত।”
ইবনু আবি লায়লা (রহ.) থেকে বর্ণিত, সাহাবি কা‘ব ইবনু উজরাহ (রা.) বলেন, তাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর সালাম কীভাবে পাঠ করতে হয় তা আমরা জানি; কিন্তু আপনার ওপর কীভাবে সালাত পাঠ করব?” তখন তিনি দরুদে ইব্রাহীম শিক্ষা দেন। সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৩৫৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৬।
দরুদ পাঠের বিশাল ফজিলত
দরুদ পাঠের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সহিহ হাদিসগুলোর একটি হলো আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার সালাত পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার সালাত পাঠ করেন।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮।
অর্থাৎ একজন বান্দা আন্তরিকতার সঙ্গে রাসুল ﷺ-এর ওপর একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ তাআলা তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন—এটি দরুদের অসাধারণ মর্যাদা।
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন তাঁর সবচেয়ে নিকটবর্তী ব্যক্তি হবে সে, যে তাঁর ওপর সবচেয়ে বেশি দরুদ পাঠ করেছে। জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ৪৮৪।
এ কারণে একজন মুমিনের জীবনে দরুদকে নিয়মিত আমল হিসেবে রাখা অত্যন্ত সুন্দর অভ্যাস।
তাহলে এক দিনে বেশি দরুদ কীভাবে পড়বেন?
বেশি দরুদ পড়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো একবারে বিশাল সংখ্যা নির্ধারণ না করে দিনের বিভিন্ন সময়কে কাজে লাগানো।
১. ফজরের পর
ফজরের নামাজের পর কিছু সময় কুরআন, যিকির ও দোয়ার জন্য রাখা যায়। এই সময় মোবাইল হাতে নেওয়ার আগে কয়েকবার দরুদ পড়ার অভ্যাস করুন।
আপনি চাইলে ১০ বার, ২০ বার বা নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী আরও বেশি পড়তে পারেন। সংখ্যা নির্ধারণ করলে সেটিকে শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত বিশেষ সংখ্যা মনে করা যাবে না; এটি হবে নিজের রুটিন তৈরির জন্য।
২. যাতায়াতের সময়
বাসে, ট্রেনে, রিকশায় বা হেঁটে যাওয়ার সময় অনেক মানুষ অযথা মোবাইল স্ক্রল করেন। সেই সময়টি দরুদের জন্য ব্যবহার করা যায়।
যদি আপনার যাতায়াতের সময় ২০–৩০ মিনিট হয়, তাহলে সেই সময়ের একটি অংশ দরুদ পাঠে ব্যয় করতে পারেন।
৩. কাজের বিরতিতে
অফিস, ব্যবসা বা পড়াশোনার মাঝখানে ছোট ছোট বিরতি আসে। প্রতিবার বিরতিতে কয়েকবার দরুদ পড়ার অভ্যাস করলে দিনের শেষে সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।
এখানে মূল বিষয় হলো—দরুদের জন্য আলাদা বিশাল সময়ের অপেক্ষা না করে ছোট সময়গুলো কাজে লাগানো।
৪. ঘরের কাজের সময়
যেসব কাজের সময় মনোযোগের চাপ কম থাকে, যেমন হাঁটা, ঘর গোছানো বা অপেক্ষা করা—এসব সময়েও দরুদ পড়া যেতে পারে।
তবে এমন কাজের সময় দরুদ পড়বেন না যেখানে আপনার পূর্ণ মনোযোগ প্রয়োজন এবং ভুল করলে ক্ষতি হতে পারে।
৫. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে রুটিন
দরুদকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঙ্গে যুক্ত করা খুব সহজ একটি পদ্ধতি।
যেমন—
- ফজরের পর দরুদ
- যোহরের পর দরুদ
- আসরের পর দরুদ
- মাগরিবের পর দরুদ
- এশার পর দরুদ
এভাবে প্রতিটি নামাজের পর কিছু সময় দরুদের জন্য রাখলে নিয়মিত আমল তৈরি হবে।
বিশেষ করে নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দরুদে ইব্রাহীম পাঠ করা সুন্নাহর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবাদের এটি শিক্ষা দিয়েছেন।
৬. জুমার দিনে দরুদ আরও বেশি পড়ুন
জুমার দিন দরুদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হলো জুমার দিন। সুতরাং সে দিনে আমার ওপর বেশি বেশি সালাত পাঠ করো।”
সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের সালাত আপনার কাছে কীভাবে পেশ করা হবে, যখন আপনি তো দেহে বিলীন হয়ে যাবেন?” রাসুল ﷺ বললেন, “আল্লাহ নবীদের দেহ মাটির জন্য হারাম করে দিয়েছেন।”
সুনান আবু দাউদ, হাদিস ১০৪৭।
তাই জুমার দিনকে দরুদের বিশেষ দিনের মতো ব্যবহার করা যেতে পারে।
৭. ছোট লক্ষ্য দিয়ে শুরু করুন
অনেকে প্রথম দিনেই কয়েকশ বা কয়েক হাজার দরুদের লক্ষ্য ঠিক করেন। তারপর নিয়ম ধরে রাখতে না পেরে হতাশ হয়ে যান।
এর চেয়ে ভালো হলো—
প্রথমে অল্প → তারপর নিয়মিত → এরপর ধীরে ধীরে বৃদ্ধি।
উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি প্রতিদিন ৫০ বার দিয়ে শুরু করেন, পরে ১০০, ২০০ বা তার বেশি করতে পারেন—তাহলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়াতে পারেন।
তবে মনে রাখতে হবে, ১০০, ৫০০ বা ১০০০—কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নিজে থেকে শরিয়তের নির্ধারিত ফজিলতপূর্ণ সংখ্যা হয়ে যায় না।
৮. দরুদ পড়ার সময় অর্থের দিকে মনোযোগ দিন
শুধু দ্রুত সংখ্যা বাড়ানোর জন্য অত্যন্ত দ্রুতগতিতে দরুদ পড়া উচিত নয়। দরুদের শব্দগুলো স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা এবং অর্থ উপলব্ধি করার চেষ্টা করা উচিত।
কারণ ইবাদতের সৌন্দর্য শুধু সংখ্যায় নয়; ইখলাস, সম্মান, ভালোবাসা ও মনোযোগেও রয়েছে।
৯. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করুন
দরুদ শুধু মুখের উচ্চারণ নয়। এটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের প্রকাশ।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর সালাত পাঠ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর সালাত পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।”
সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬।
এই আয়াত আমাদের দরুদের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয়।
১০. দরুদের সঙ্গে দোয়া করুন
দরুদ পাঠের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে নিজের প্রয়োজনের কথা বলুন। কারণ দোয়ার আদবের মধ্যে আল্লাহর প্রশংসা ও রাসুল ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফাদালাহ ইবনু উবাইদ (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নামাজের মধ্যে দোয়া করছিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও নবী ﷺ-এর ওপর দরুদ পাঠ না করেই দোয়া করছিলেন। রাসুল ﷺ তাকে শিক্ষা দিলেন যে আগে আল্লাহর প্রশংসা করবে, এরপর নবী ﷺ-এর ওপর সালাত পাঠ করবে, তারপর নিজের প্রয়োজনের কথা বলবে। জামে‘ আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৪৭৭।
এ থেকে বোঝা যায়, দরুদকে দোয়ার সঙ্গে সুন্দরভাবে যুক্ত করা যায়।
এক দিনের একটি সহজ রুটিন
একজন ব্যক্তি চাইলে নিজের সুবিধা অনুযায়ী এমন রুটিন করতে পারেন:
ফজরের পর: ২০ বার
যাতায়াতের সময়: ৩০ বার
যোহরের পর: ২০ বার
বিকেলে: ২০ বার
মাগরিবের পর: ৩০ বার
এশার পর: ৩০ বার
ঘুমানোর আগে: ২০ বার
এভাবে মোট ১৭০ বার হতে পারে।
অবশ্য এটি কোনো শরিয়ত নির্ধারিত সংখ্যা নয়; শুধু একটি উদাহরণ। কেউ কম পড়তে পারেন, কেউ বেশি পড়তে পারেন। মূল উদ্দেশ্য হলো নিয়মিত হওয়া।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
দরুদ পড়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
প্রথমত, সহিহ দলিল ছাড়া “অমুক সংখ্যায় অমুক ফল নিশ্চিত”—এমন দাবি করবেন না।
দ্বিতীয়ত, দরুদকে শুধু দুনিয়াবি চাহিদা পূরণের যন্ত্র হিসেবে দেখবেন না। এটি নিজেই একটি মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত।
তৃতীয়ত, নামাজের ফরজ, ওয়াজিব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বাদ দিয়ে শুধু দরুদের সংখ্যা বাড়ানো ঠিক নয়।
চতুর্থত, উচ্চারণে যত্ন নিন এবং সম্ভব হলে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে প্রমাণিত দরুদের ভাষা ব্যবহার করুন।
শেষ কথা
এক দিনে অনেক বেশি দরুদে ইব্রাহীম পড়ার রহস্য কোনো জাদুকরী পদ্ধতিতে নয়; বরং সময়কে ভাগ করে নেওয়া, নিয়মিত হওয়া এবং ভালোবাসার সঙ্গে দরুদ পাঠ করা।
আপনি যদি প্রতিদিন অল্প অল্প করে শুরু করেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সঙ্গে অভ্যাসটি যুক্ত করেন, যাতায়াত ও অপেক্ষার সময় কাজে লাগান এবং জুমার দিনে আরও বেশি দরুদ পড়েন—তাহলে ইনশাআল্লাহ আপনার দৈনন্দিন জীবনে দরুদের একটি সুন্দর অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে।
মনে রাখবেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার সালাত পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার সালাত পাঠ করেন।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮।
তাই সংখ্যার প্রতিযোগিতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—নিয়মিততা, ইখলাস এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করার তাওফিক দিন, আমাদের আমল কবুল করুন এবং কিয়ামতের দিন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শাফাআত লাভের সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।
