মানুষের জীবনে অসুস্থতা, বিপদ ও পরীক্ষা আসতেই পারে। কারো ক্যান্সার হয়েছে শুনলে বা কাছ থেকে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে ভয় ও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়। তখন অনেকেই জানতে চান—ইসলামে কি এমন কোনো দোয়া আছে, যা কোনো রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখে পড়লে আল্লাহ তাআলা আমাদের সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রাখবেন?
এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে। তবে শুরুতেই বিষয়টি পরিষ্কার করা জরুরি—হাদিসে ক্যান্সার শব্দটি নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ নেই। বরং কোনো ব্যক্তিকে কোনো ধরনের বিপদ বা পরীক্ষায় আক্রান্ত অবস্থায় দেখলে একটি দোয়া পড়ার কথা বলা হয়েছে। তাই ক্যান্সারসহ বিভিন্ন গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে এই দোয়াটি পড়া যেতে পারে।
হাদিসে বর্ণিত দোয়াটি কী?
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে কেউ যদি বলে—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا
উচ্চারণ:
“আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি ‘আফানী মিম্মাবতালাকা বিহি, ওয়া ফাদ্দালানী ‘আলা কাছিরিম মিম্মান খালাকা তাফদিলা।”
অর্থ:
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তোমাকে যে বিপদে পরীক্ষা করেছেন, তা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তাঁর সৃষ্টির অনেকের ওপর আমাকে বিশেষ অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।”
জামে‘ আত-তিরমিজি ৩৪৩১-এ উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, কোনো বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে এই দোয়া পড়লে আল্লাহ তাকে সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রাখবেন—এমন বক্তব্য হাদিসে এসেছে।
আর জামে‘ আত-তিরমিজি ৩৪৩২-এ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে অনুরূপ বর্ণনা এসেছে। ইমাম তিরমিজি এটিকে হাসান গরিব বলেছেন।
তাহলে ক্যান্সার রোগীকে দেখলে কি এই দোয়া পড়া যাবে?
হ্যাঁ, পড়া যেতে পারে। কারণ হাদিসে শুধু একটি নির্দিষ্ট রোগের কথা বলা হয়নি; বরং “মুবতালা” বা বিপদগ্রস্ত/পরীক্ষিত ব্যক্তিকে দেখার কথা বলা হয়েছে।
ক্যান্সার একটি গুরুতর অসুস্থতা। তাই কোনো ক্যান্সার আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখলে নিজের মনে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে এই দোয়া পড়া যেতে পারে।
তবে দোয়াটি রোগীকে শুনিয়ে পড়া উচিত নয়। কারণ দোয়াটির মধ্যে নিজের সুস্থতার জন্য আল্লাহর প্রশংসা রয়েছে। রোগীর সামনে এটি উচ্চারণ করলে তার মনে কষ্ট বা অপমানের অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে। বরং মনে মনে বা এমনভাবে পড়া উত্তম, যাতে অসুস্থ ব্যক্তি বিব্রত না হন।
“কখনো ক্যান্সার হবে না”—এই কথাটি কি হাদিসে আছে?
এখানে সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরি।
অনেক জায়গায় প্রচলিতভাবে বলা হয়—
“কোনো ক্যান্সার রোগীকে দেখে এই দোয়া পড়লে জীবনে আর কখনো ক্যান্সার হবে না।”
এভাবে ক্যান্সারকে নির্দিষ্ট করে বলা হাদিসসম্মত নয়।
হাদিসে সাধারণভাবে বলা হয়েছে, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে এই দোয়া পড়লে আল্লাহ সেই বিপদ থেকে নিরাপদ রাখবেন। কিন্তু ক্যান্সার সম্পর্কে চিকিৎসাগতভাবে “জীবনে কখনো হবে না”—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়।
অতএব মুসলিমের উচিত দোয়াটিকে আল্লাহর ওপর ভরসা ও সুস্থতার একটি আমল হিসেবে গ্রহণ করা, কিন্তু এটিকে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে নিশ্চিত চিকিৎসা বা শতভাগ গ্যারান্টি হিসেবে প্রচার না করা।
দোয়াটির মধ্যে কী শিক্ষা রয়েছে?
এই ছোট দোয়াটির মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা রয়েছে।
১. সুস্থতার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া
আমরা যখন একজন অসুস্থ মানুষকে দেখি, তখন প্রথমেই উপলব্ধি করা উচিত—আমিও এমন পরীক্ষায় পড়তে পারতাম। আল্লাহ আমাকে সুস্থ রেখেছেন, তাই তাঁর শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন।
দোয়াটি শুরু হয়েছে—
“আলহামদু লিল্লাহ”—সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
অর্থাৎ সুস্থতা নিজের যোগ্যতার কারণে নয়; এটি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত।
২. অন্যের বিপদ দেখে অহংকার করা যাবে না
কোনো অসুস্থ মানুষকে দেখে কখনো মনে করা উচিত নয়—
“আমি তো ভালো আছি, আমার কিছু হবে না।”
কারণ সুস্থতা পরিবর্তনশীল। আজ যে সুস্থ, কাল সে অসুস্থ হতে পারে। আজ যে অন্যের জন্য দোয়া করছে, কাল হয়তো তার নিজের জন্য অন্যরা দোয়া করবে।
তাই এই দোয়াটি অহংকারের দোয়া নয়; বরং শুকরিয়া ও বিনয়ের দোয়া।
৩. রোগীকে ছোট করা যাবে না
ইসলাম অসুস্থ মানুষকে সম্মান করতে শেখায়। কোনো রোগীকে দেখে ভয়, ঘৃণা বা অবজ্ঞা করা উচিত নয়।
বরং তার জন্য দোয়া করতে হবে, সাহস দিতে হবে এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে হবে।
রোগীর জন্য কোন দোয়া করা যায়?
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেখানো আরেকটি অত্যন্ত সুন্দর দোয়া রয়েছে:
أَسْأَلُ اللَّهَ الْعَظِيمَ رَبَّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ أَنْ يَشْفِيَكَ
অর্থ:
“আমি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, যিনি মহান আরশের রব, তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।”
অসুস্থ ব্যক্তির জন্য সুস্থতার দোয়া করা মুসলিমের সুন্দর দায়িত্ব।
আর রাসুলুল্লাহ ﷺ রোগীর জন্য দোয়া করতেন:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ، أَذْهِبِ الْبَأْسَ، اشْفِ أَنْتَ الشَّافِي
অর্থ:
“হে মানুষের রব! কষ্ট দূর করে দিন। আপনি শিফাদাতা; আপনার শিফা ছাড়া কোনো শিফা নেই।”
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে—শিফা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে।
চিকিৎসা নেওয়া কি ইসলামে অনুমোদিত?
অবশ্যই। দোয়া করার পাশাপাশি চিকিৎসা গ্রহণ করাও ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সহিহ মুসলিমে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“প্রত্যেক রোগের জন্য চিকিৎসা রয়েছে। রোগের উপযোগী চিকিৎসা পাওয়া গেলে আল্লাহর অনুমতিতে রোগ নিরাময় হয়।” — সহিহ মুসলিম ২২০৪।
অতএব কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে শুধু দোয়া করে চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া ইসলামসম্মত পদ্ধতি নয়। বরং দোয়া, চিকিৎসা, ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল—সবগুলো একসঙ্গে গ্রহণ করতে হবে।
ক্যান্সার কি সংক্রামক?
ক্যান্সারকে সাধারণ সংক্রামক রোগের মতো দেখা ঠিক নয়। রোগীকে অযথা এড়িয়ে যাওয়া বা তার প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা উচিত নয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ রোগের ব্যাপারে একদিকে বলেছেন, “সংক্রমণ নেই”, আবার অসুস্থ ব্যক্তিকে সুস্থ ব্যক্তির সঙ্গে এমনভাবে না মেশানোর নির্দেশনাও এসেছে। সহিহ মুসলিম ২২২১-এ এই দুই বক্তব্যের বর্ণনা রয়েছে।
এর অর্থ হলো—ইসলাম একদিকে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখায়, অন্যদিকে বাস্তব সতর্কতাও উপেক্ষা করতে বলে না।
দোয়াটি কখন পড়বেন?
কোনো ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ বা বিপদগ্রস্ত অবস্থায় থাকলে তার দিকে তাকিয়ে মনে মনে এই দোয়াটি পড়তে পারেন।
বিশেষ করে—
- কোনো ক্যান্সার রোগীকে দেখলে
- গুরুতর অসুস্থ কাউকে দেখলে
- কোনো বড় বিপদে আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখলে
- কোনো শারীরিক পরীক্ষায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখলে
দোয়াটি পড়া যেতে পারে।
তবে মনে রাখতে হবে, এটি শুধু “ক্যান্সার প্রতিরোধের দোয়া” নয়; বরং হাদিসে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে পড়ার দোয়া হিসেবে এসেছে।
রোগীর জন্য কী করবেন?
শুধু নিজের নিরাপত্তার জন্য দোয়া না করে রোগীর জন্যও দোয়া করুন।
বলতে পারেন:
“আল্লাহ আপনাকে পূর্ণ শিফা দান করুন, আপনার কষ্ট সহজ করুন এবং আপনার জন্য উত্তম চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।”
রোগীর মনোবল বাড়ানো, তার পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসায় সহযোগিতা করাও অত্যন্ত মানবিক কাজ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
দোয়া সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক অতিরঞ্জিত দাবি ছড়িয়ে পড়ে। যেমন—
“এই দোয়া পড়লে কোনো রোগ হবে না।”
“এটি পড়লে ক্যান্সার আজীবন হবে না।”
“এই আমল করলে চিকিৎসার দরকার নেই।”
এ ধরনের বক্তব্য থেকে সতর্ক থাকা উচিত।
হাদিসের প্রকৃত বক্তব্য যতটুকু, ততটুকুই প্রচার করা উচিত। বিশেষ করে অসুস্থতা ও চিকিৎসার বিষয়ে অতিরঞ্জিত দাবি মানুষের ক্ষতি করতে পারে।
শেষ কথা
কোনো ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষকে দেখে ভয় পাওয়ার পরিবর্তে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন এবং মনে মনে পড়ুন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي عَافَانِي مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهِ، وَفَضَّلَنِي عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيلًا
উচ্চারণ:
“আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি ‘আফানী মিম্মাবতালাকা বিহি, ওয়া ফাদ্দালানী ‘আলা কাছিরিম মিম্মান খালাকা তাফদিলা।”
অর্থাৎ—
“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তোমাকে যে বিপদে পরীক্ষা করেছেন তা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং তাঁর বহু সৃষ্টির ওপর আমাকে বিশেষ অনুগ্রহ করেছেন।”
এই দোয়াটি হাদিসে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেখে পড়ার কথা এসেছে। তবে এটিকে ক্যান্সার থেকে শতভাগ আজীবন সুরক্ষার গ্যারান্টি বলা উচিত নয়। হাদিসের বর্ণনা, আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল, রোগীর জন্য দোয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা—সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুস্থতা, আফিয়াত এবং ঈমানের সঙ্গে জীবনযাপন করার তাওফিক দিন। আর যারা ক্যান্সারসহ কঠিন রোগে আক্রান্ত, আল্লাহ তাদের কষ্ট দূর করে পূর্ণ শিফায়ে কামিলা দান করুন। আমিন।
